
সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে কে
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায়ই বিভাগীয় মামলায় শাস্তি পাচ্ছেন। তাদের নানা ধরনের দণ্ড দেওয়া হয়। গুরুদণ্ড পেয়ে অনেকে চাকরিচ্যুত হচ্ছেন। তাদের চাকরিচ্যুত করেই সরকার দায় এড়াচ্ছে। বিভাগীয় মামলায় দোষীদের সাধারণ আইনে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না। এতে তারা শুধু বিভাগীয় মামলার শাস্তি পাচ্ছে। একই অপরাধের জন্য সাধারণ মানুষ যে আইনে শাস্তি পান সরকারি কর্মচারী হওয়ার কারণে তিনি তা এড়িয়ে যেতে পারছেন।
এভাবে সাধারণ মানুষের সাথে তাদের বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা মেহেদী হাসান সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি ছিলেন সেফ হোমের দায়িত্বে। দেশটিতে যেসব বাংলাদেশি নারী কর্মী সমস্যায় পড়েন তারা সেফ হোম আশ্রয় নেন। মেহেদী হাসান সেই আশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেন। নিরীহ নারীদের তিনি ধর্ষণ করেছেন। দীর্ঘ বিভাগীয় বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপরই প্রশ্ন ওঠে চাকরিচ্যুতিই কি সব? সে কি সাধারণ আইনের উর্ধ্বে? যদি তা না হবে তাহলে কে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের জন্য নির্ধারিত আইনে মামলা করবে?
এ ক্ষেত্রে সরকারের কাঁধেই এ দায়িত্ব বর্তায়। কারণ সে সরকারি দায়িত্বে থেকে এই অপকর্ম করেছে। তা ছাড়া ঘটনা বিদেশে হওয়ার কারণে ভিকটিমের পক্ষে বা তার পরিবারের পক্ষে এই বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া খুব সহজ না। এসব ক্ষেত্রে সরকার দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।
এর আগে মুক্তিযোদ্ধার সনদ জাল করার অভিযোগে চার সচিবের চাকরি চলে যায়। তারা সরকারের শীর্ষ পদে থেকে এ জালিয়াতি করেছেন। সরকার শুধু তাদের চাকরিচ্যুত করেই দায়িত্ব এড়িয়েছে। দেশের একজন নাগরিক এ সনদের জালিয়াতি করলে সাধারণ কোর্টে তার শাস্তি হতো। সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তারা সেই শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
প্রতিটি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানবসম্পদ হলো প্রাণ, কিন্তু আমাদের দপ্তরগুরোর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সব থেকে বেশি অবহেলা। মানবসম্পদ বিষয়টিকে গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধান না করে এড়িয়ে যায়। আর দিনের পর দিন এভাবে সমস্যা বড় হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এমন কিছু কাজ করা হয়েছে যেগুলো সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রতিষ্ঠানে সব থেকে লোভনীয় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় যে ডেস্কের বিদেশ ভ্রমণ আছে সেই ডেস্ককে। তারপর লোভনীয় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় যে ডেস্ক থেকে বাড়তি অর্থ আয়-রোজগারের সুযোগ সুবিধা আছে। এরপরের ডেস্ক হলো যেখান থেকে অন্যদের ওপর হম্বিতম্বি করা যায়। যেগুলো পরিশ্রমসাধ্য এবং যথাযথ কাজের ফলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম হয় সেগুলোতে কেউ কাজ করতে চায় না! কারণ তারা পরিশ্রমের মূল্য পায় না, বিপরীতে নানা বিরূপ সমালোচনা শুনতে হয় যা ক্যারিয়ারের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রশিক্ষণে কোনো এক দপ্তরের প্রশাসন ডেস্কের একজন খুব লজ্জিত ও কুণ্ঠিত ভাবে বসে ছিলেন। তিনি ভাবছেন এখানে যারা আছেন প্রত্যেকের কাজের বা ডেস্কের সুন্দর নাম আছে এবং শুনলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু সে তো দেখে প্রশাসন! এক ঘটনায় হঠাৎ তিনি মধ্যমণি হয়ে গেলেন! সেই আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি একে একে যখন পরিচয় নিচ্ছেন তখন প্রশাসন পরিচয় পেয়েই বললেন, ‘ইউ আর দ্য রাইট পারসন’। তুমিই আসল লোক যে প্রশাসন দেখে। কারণ প্রশাসন পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রাণ এবং চালিকাশক্তি। তুমি যদি না বোঝ প্রতিষ্ঠানের কোন ডেস্কের কি কাজ তাহলে প্রতিষ্ঠান চলবে না। তুমি সব কাজের রসদ যোগাও- তাই তোমাকে সব জানতেই হবে।
কিন্তু অনেক সংস্থার প্রশাসন মানেই বিরক্তিকর, অপ্রিয়, গাধার খাটুনি এসব। কারণ প্রশাসন ডেস্কে কাজ করলে সবাই ধরে নেয় সে কোনো কাজ শেখেনি। একে দিয়ে কি আর হবে! ফলে সামগ্রিকভাবে সেসব প্রতিষ্ঠানের অবনমন হয়। কারণ কর্তৃপক্ষ নিজেই প্রতিষ্ঠানের প্রাণের অবহেলা করলে সে প্রাণ কি-ই বা এমন ভালো করবে!
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা যাচ্ছেতাই অবস্থা থেকে উত্তরণ না করলে উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে যাবে। আবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সরকারের উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হবেন। সরকার চায় নারীদের বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনীতি দৃঢ় করতে। কোথায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দরদ দিয়ে কাজ করে সরকারের উদ্দেশ্য পূরণ করবে- তা না করে সে রক্ষক থেকে ভক্ষক হয়ে যায়। এটা ঘটে প্রশাসনের ব্যর্থতায়, উপযুক্ত লোক বাছাই করতে না পারায়।



