
‘আমরা যা ভালোবাসি, তা নিজের করে রাখতে চাই। সে হোক প্রেমিক বা পুষ্প!’
যারা ফুলকে ভালোবেসে গাছ থেকে নির্মম ভাবে গাদা ধরে ফুল ছিঁড়ে হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বা গাছের ফুল খোপায়, গলায় পরে পুষ্প বিলাস করেন , তাদের আমার কাছে ভীষণ অমানবিক মনে হয় ।
ফুল গাছে যতটা সৌন্দর্য ছড়ায় , মানুষের হাতে ততটা নয়। গাছে ফুল ফুটলে বিভিন্ন মৌমাছি আসে, নাম না জানা অনেক পোকা ফুলের মধু খায়। অনেক পাখি এসে ফুলের মধু খেয়ে বেঁচে থাকে। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। সে মধু আমাদের জীবনে ঔষধি হিসেবে কাজে লাগে। পোকামাকড় ফুলে ফুলে উড়ে মধু খাওয়ার ফলে পরাগায়ন ঘটে এবং উদ্ভিদের প্রজননের জন্য অপরিহার্য।
গাছ, ফল-ফুল , পাখি, পোকা, সাপ, ব্যাংঙ, কেঁচো, ইঁদুর সৃষ্টির এই সকল প্রাণী পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এবং জীবন চক্র বিকাশের ধারাকে পরিপূর্ণ করতে একটি খাদ্য চক্র বা খাদ্য শৃঙ্খল অপরিহার্য। আমি মনে করি , জীবন চক্র বিকাশে খাদ্য চক্র ভীষণ ভাবে সহায়ক এবং একটি অন্যটির পরিপূরক।
আপনি মনে করেন, নদী বা সমুদ্রের ঢেউ আপনার ভীষণ প্রিয়। আমরা চাইলেই কি সেই ঢেউ আটকে রাখতে পারি? নাকি সেই ঢেউ আমরা আজলা ভরে তুলে নিজের কাছে বয়াম ভরে রাখতে পারি?
নদী, সমুদ্র, খাল-বিলের পানিতে বাতাসের সাথে ঢেউ তৈরি হয়। আমরা সেই প্রকৃতির কাছে গিয়ে ঢেউয়ের সাথে মন ভাসিয়ে দিলেই সুখ খুঁজে পাই।
জলের এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ! মানুষের মনে সমস্ত কথা জল শুনতে পায়! সমস্ত কষ্ট ভাসিয়ে নিতে পারে এই ঢেউ! মনে এক শান্তির দোলা দেয়।
প্রকৃতির অদ্ভুত ক্ষমতা এটাই, আপনার সমস্ত কথা প্রকৃতির সকল কিছু শুনতে পায় । কারণ, আমরা সকলেই প্রকৃতির অংশ।
তেমনি পাহাড়ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। পাহাড় আপনার পছন্দ বলে, আপনি পাহাড় তুলে (হনুমানজির মতো কাঁধে করে) আপনার ঘরে আনতে পারবেন না। আপনার ড্রইং রুমের সেন্টার টেবিলের উপর একটা বিশাল পাহাড় এনে রাখলে নিশ্চয়ই সেটা ভালো দেখাবে না। যে পাহাড়ের সৌন্দর্য সোনালী রোদ্দুরে চকচক করে অথবা মেঘের কোল ঘেষে আদুরে হয়ে যে পাহাড় ঘুমিয়ে থাকে , সে পাহাড়ের সৌন্দর্য আপনার লিভিং রুমে ম্লান হবেই! তাছাড়া এই পাহাড়ের সাথে মিশে আছে কতশত প্রাণী ও বৃক্ষের জীবন । সে জীবন আপনার লিভিং রুমের ভেতরে এসে নিশ্চয়ই বেঁচে থাকা দুরূহ।
তেমনি বেঁচে থাকে না, মুঠো ভরে গাছ থেকে ভেঙে আনা ফুল। দুদিন পরেই সে ফুল চলে যায় ময়লার ভাগাড়ে। আহা অতি ভালোবাসার শেষকৃত্য হয় ময়লার ভাগাড়ে!
আজকাল বাণিজ্যিক ভাবে ফুলের চাষ করা হচ্ছে। কারণ, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এই ফুলের ব্যবহার করা হয়। আপনি চাইলে আপনার পছন্দের সমস্ত ফুল তাদের কাছ থেকে কিনে আনতে পারেন। আপনি যদি ফুল বিক্রেতার কাছ থেকে ফুল কিনে ফুলের সৌরভ উপভোগ করেন , তবে তারা হয়ত একথালা ভাতের ঘ্রাণ পাবে।
প্রকৃতি প্রেমিরা যখন প্রকৃতির কাছে যাবেন , তখন প্রকৃতির মত উদার হয়ে যাওয়া উচিত। আপনিও প্রকৃতির সাথে মিশে যান । ফুল পছন্দ হলে গাছ থেকে ঝরে পড়া ফুল সংগ্রহ করে নিয়ে মালা গাঁথার আয়োজন করুন। গাছের ফুল ভেঙে আপনি নিজের হাতে নিয়ে একাই তার সৌন্দর্য হরণ না করে, গাছের ফুলকে গাছেই বাঁচতে দিন এবং গাছেই তার সৌন্দর্য ছড়াতে দিন । এতে করে সমস্ত প্রকৃতি প্রেমিরাই ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবে।
আমরা বাঙালিরা জন্মগত ভাবেই আমাদের স্বভাবে সকল কিছু নিজের করে রাখার প্রবনতা। আমরা যা কিছু ভালোবাসি তা আমার করে রাখতে চাই।
সে হোক প্রেমিক বা পুষ্প!
আমার আমার করে করে আমরা সব হারিয়ে ফেলি। প্রকৃতির সবকিছুই ছেড়ে দিয়ে ভালোবাসুন। যেমন করে ভালোবাসি চাঁদকে , ভালোবাসি যেমন জোছনাকে!
আসুন আমরা সকলেই তেমনি করে ভালোবাসায় ডুব দেই শৃঙ্খল হীন প্রকৃতির মাঝে। আত্মতৃপ্তির প্রবণতায় প্রকৃতিকে ভাসিয়ে না দিয়ে ,আমরা নিজেরাই ভেসে যাই প্রকৃতির মাঝে। সকলের কাছেই প্রকৃতি অক্ষত থাকুক। সকলের অটুট ভালোবাসায় বেঁচে থাকুক প্রকৃতি। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করুক সকলেই।
পৃথিবীর সকল প্রাণীর শান্তি হোক।



