
চ্যাটিং!
মাহমুদ রেজা চৌধুরী
বহু বছর আগের কথা। সম্ভবত, ২০০৭-৮ সালে উল্লেখিত শিরোনামে একটা লেখা পড়েছি মনে পড়ে। লেখাটা যখন লেখা হয় তখনো বিষয়টা এতটা “ভাইরাস” ছিল না। এখন এই বিষয়টা অনেক জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণ ও যুব সমাজে। অনেকের মতে, মধ্যবয়সীদের মধ্যেও বিষয়টা এখন ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমাজ পরিবর্তনের এটা আরেক সুচক। সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের পরিবর্তন।
আজ থেকে প্রায় দুই যুগের কাছাকাছি হবে। ডিসকভারি চ্যানেলে হংকংয়ের বার্ষিক উৎসব উপলক্ষে একটা বিজ্ঞাপন দেখানো হতো তখন। বিজ্ঞাপনের মূল বিষয় ছিল, একটা রোবট হংকং উৎসবে এসছে। একটা পাখি তার জন্য ঠোঁটে করে দুইটা ফল নিয়ে আসে। একটা প্রজাপতি তার চোখের পাতা দুই টেনে বন্ধ করে দেয়-একটা হাতি তাকে আস্তে, আস্তে শুইয়ে দেয়। ক’টা বেড়াল তার মাথার নিচে একটা বালিশ দিয়ে দেয়। পরিশেষে যখন রোবটটি উৎসব ছেড়ে যায় তখন তার চোখ থেকে দুই ফোটা পানি পড়ে। অর্থাৎ হংকংয়ের আতিথেয়তা যন্ত্রের চোখেও পানি এনে দেয়। এই বিজ্ঞাপন দেখে মনে হয়েছিল তখন, যেহেতু মানুষ তার আবেগ-অনুভূতি গুলি ক্রমশ হারাতে বসছে তাই একটা যন্ত্রের মধ্যে অনুভূতির প্রকাশ। এটা ছিল মানুষের কাছে একটা বার্তা পাঠানোর চেষ্টা। এর আরেকটা মেসেজ বা বার্তা ছিল, আমরা যে প্রায়ই বলি, বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। এটা সত্যি না। মানে, বিজ্ঞানের মধ্যেও আবেগ আছে!
‘আগুন থেকে ক্লোনিং’। সভ্যতার এত বছরের ইতিহাসে মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি কম্পিউটার। আর মানব জীবনে এক অভাবনীয় গতির সঞ্চার করাই কম্পিউটারের জনপ্রিয়তার অন্যতম এক কারণ। প্রয়োজনীয়তা ছাড়াও কম্পিউটার শুধু গতির জোরেই মানুষের অন্যতম প্রিয় বন্ধু এখন। বর্তমানে এই বন্ধুত্বের গারত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই “চ্যাটিং” নামে একটা ধারণার গুরুত্ব বাড়ছে বলে বলা যায়।
ডিকশনারি বা অভিধানগত অর্থে চ্যাটিং মানে খোশগল্প করা। কিন্তু এই “সাইবার যুগে” চ্যাটিং শুধু আড্ডা বা খোশগল্পের সীমিত সীমারেখা অতিক্রম করে এক ধরনের নিয়মিত যোগাযোগ, ব্যক্তির আবেগ-আদান প্রদানেও আত্মতৃপ্তির মাধ্যম হয়ে উঠছে। অস্বীকার করা যায় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যা অনেক গবেষণাতেও উঠে এসছে, “চ্যাটিং” নামক ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে প্রথম ও প্রধান ভাবে যে বিষয়টা কাজ করে তা ব্যক্তির একাকীত্ব। বর্তমান জীবন যাত্রার দ্রুততার সাথে তাল মিলাতে গিয়ে মানুষের সাথে মানুষের মেশা বা বন্ধুত্ব করার সময় সুযোগ। এই দুইটাই খুবই কমে গেছে। এখন মানুষ আগের মত আরেকজন মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে গেলে সাধারণত ইন্টারনেটের মাধ্যমে করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। কারণ এই পদ্ধতিতে যোগাযোগ বা চ্যাটিং অনেকটাই সহজ এখন। এই পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য গুলি যেমন!
১) সাধারণত প্রত্যেক ওয়েবসাইটে চ্যাটিং এর সুবিধা আছে।
২) কম্পিউটারের মাউস ক্লিক করে চ্যাটিংয়ে মহাদেশ ঘুরে আসাও যায়।
৩) এতে সঙ্গী যদি পছন্দ হয় তাহলে, দুইজন নির্দিষ্ট দিন ও সময় ঠিক করে নিতে পারে যখন দুইজনই কম্পিউটারের সামনে বসে।
৪) কম্পিউটারের কিবোর্ডে টাইপ করে উভয়ে উভয়ের প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে পরস্পরকে জানার চেষ্টা করে।
৫) পাশাপাশি এর মাধ্যমে দ্রুত “গুজব” ছড়ানো হয় ও যায়। সত্যকে মিথ্যা, আর মিথ্যাকে সত্য করা হয়। এইসবের দৃষ্টান্ত এখনতো রাত, ভোর দেখি ও শুনি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণত দুই ধরনের চ্যাটিং বা “চ্যাটার” পাওয়া যায়। অনিয়মিত ও নিয়মিত চেটারদের চ্যাটিংয়ের পদ্ধতি প্রয়োজনীয়তা ও মনমানসিকতায় কিছু পার্থক্য থাকে। যেমন অনিয়মিত চ্যাটারদের ক্ষেত্রে:
ক) এদের সাধারনত নিজস্ব কম্পিউটার থাকেনা। অনেক আগে দেখা যেত এরা দোকানে পয়সা খরচ করে চ্যাট করতে বসে। এই কারণে শুরুতে শুরুতে এই চ্যাট করার স্থায়িত্ব দীর্ঘ হতো না। এখন অবশ্য সেই সময় বদলে গেছে।
খ) এদের মধ্যে অনেকে তখন নিজের নাম গোপন করে ভিন্ন নামে চ্যাটিং শুরু করত। অনেকে বলেন, মেয়েদের মধ্যে নিজেকে ছেলে আর ছেলেদের মধ্যে নিজেকে মেয়ে বলে পরিচয় দেবার প্রবণতা তখনও ছিল। এখন এটা আরো বেড়েছে।
গ) এরা মূলত প্রয়োজনে চ্যাট করে না। অনেকের মতে, অনেকে এটা করে নিতান্ত তাদের সময় কাটানোর লক্ষ্যে।
আর যারা নিয়মিত এতে অংশ নেন, তাদের বৈশিষ্ট্য:
ক) এদের সবারই মূলত নিজস্ব কম্পিউটার থাকে। তাই এদের এই চ্যাটিংয়ের সময় দীর্ঘ হয়।
খ) এই ক্ষেত্রেও অনেকে তাদের মূল পরিচয় গোপন রাখে। এটা যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে গভীর রাতে বেশি হয়। তাই এখানে কিছু অসামাজিক আলাপ-আলোচনাও চলে।
গ) এই ক্ষেত্রে দূরের বন্ধু বা পরিচিতদের সাথে টেলিফোন বা ইমেইলের যোগাযোগের তুলনায় খরচ এখানে অনেক কম। এখানে একটা “লাইভ” যোগাযোগের সুযোগ থাকে যা চিঠি বা ইমেলে থাকে না।
ঘ) এতে অচেনা মানুষের সাথেও কথা বলার চাইতে চ্যাটিং মাধ্যমে কথা বলা অনেকের জন্য সহজ হয়।
ঙ) এর মাধ্যমে অনেক সময় বন্ধুত্ব,প্রণয় ও বিয়ে এবং অনেক সম্পর্কে গভীরতাও বাড়ে।
এইসব নানান কারণে বর্তমান সময়ে চ্যাটিং’র জনপ্রিয়তা নানান সামাজিক ইতিবাচক সম্পর্কের পাশাপাশি অনেক রকম জটিল সম্পর্ক বা অসামাজিক সম্পর্ককেও বিশেষ করে তরুণ ও যুব সমাজের মধ্যে অনেকটা সুনামির মতো। কোথাও কোথাও আবার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের নির্ভরতা যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন অনেকটাই যান্ত্রিক রোবটের মত। কিন্তু হংকংয়ের সেই রোবটের মত না। যে রোবটের চোখে পানি আসার গল্প আমরা শুরুতে পড়লাম।
এই ছোট্ট লেখার শেষে চ্যাটিংয়ের আরেকটা রূপ চার লাইনে ব্যাখ্যা করবার লোভ সামলাতেও পারছিনা। এই চার লাইনের লেখা কবিতা লিখেছেন আরেক নিভৃতচারী কবি, বদিউজ্জামান নাসিম। যদিও কবি চ্যাটিংয়কে উদ্দেশ্য করে এই “চার লাইন” লিখেছেন কিনা, তা জানিনা। তবু নিজের কাছে মনে হলো উল্লেখিত লেখার সাথে এর একটা মিল আছে বলে।
“জাগে কিষাণ আর কিষাণী
গভীর অনুরাগে;
গোপন কিছু রোপন চায়
রাত পোহাবার আগে”।



