নিউ ইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্প প্রশাসনের মামলা খারিজ

নিউইয়র্কের ‘স্যাংচুয়ারি’ আইন বহাল রাখার পথে বড় আইনি অগ্রগতি, স্থানীয় প্রশাসনকে অভিবাসন অভিযানে বাধ্য করা যাবে না: ফেডারেল আদালত • রায়কে স্বাগত মেয়র জোহরান মামদানির • অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বস্তি

হোসনেআরা চৌধুরী

নিউইয়র্ক সিটির অভিবাসন সুরক্ষাসংক্রান্ত ‘স্যাংচুয়ারি সিটি’ আইন চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্প প্রশাসনের করা মামলা খারিজ করে দিয়েছেন ফেডারেল আদালত। গত ১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক রামন ই. রেয়েস জুনিয়র এ আদেশ দেন। আদালত বলেছেন, ফেডারেল সরকারকে অভিবাসন আইন কার্যকরে সহযোগিতা করতে রাজ্য ও স্থানীয় সরকারকে বাধ্য করার মতো আইনি ভিত্তি এই মামলায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই সঙ্গে, নিউইয়র্ক সিটির নীতিমালা ফেডারেল আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—প্রশাসনের এ যুক্তিও আদালত প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আদালতের এই সিদ্ধান্ত নিউইয়র্ক সিটির দীর্ঘদিনের অভিবাসন নীতি নিয়ে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে চলমান বিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি-আমেরিকানসহ বিভিন্ন অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের নীতি, পুলিশি সহযোগিতা এবং সরকারি সেবা গ্রহণের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় রায়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

কী রয়েছে নিউইয়র্কের স্যাংচুয়ারি আইনে?

নিউইয়র্ক সিটির স্যাংচুয়ারি নীতির মূল লক্ষ্য হলো, স্থানীয় পুলিশ ও নগর সংস্থাগুলোকে ফেডারেল সরকারের দেওয়ানি অভিবাসন আইন প্রয়োগের নিয়মিত বাহিনীতে পরিণত না করা। এসব নীতির আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট—আইসিইর অনুরোধে কাউকে আটক রাখা এবং স্থানীয় হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য বিনিময়ের ওপর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এর অর্থ এই নয় যে, নিউইয়র্ক সিটি ফেডারেল অভিবাসন আইন বাতিল করতে পারে কিংবা আইসিইর কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে পারে। বরং স্থানীয় পুলিশ ও নগর সংস্থাগুলো কোন পরিস্থিতিতে ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করবে, তা নির্ধারণে নগরীর নিজস্ব আইন ও নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আদালতে কেন হারল ট্রাম্প প্রশাসন?

ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক সিটি ও নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করে। প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, নগরীর স্যাংচুয়ারি নীতির কারণে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং বহিষ্কারের আওতায় থাকা কিছু ব্যক্তিকে স্থানীয় হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু বিচারক রেয়েসের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ফেডারেল আইন সাধারণভাবে রাজ্য বা স্থানীয় সরকারকে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে অংশ নিতে বাধ্য করে না। স্থানীয় সরকারের কর্মী ও সম্পদকে ফেডারেল সরকারের কাজে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করানোর চেষ্টাও সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে।

আদালত আরও মনে করেন, নগরীর নীতিমালার বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের আনা আইনি দাবিগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে স্যাংচুয়ারি আইন বাতিলের জন্য প্রশাসনের আবেদন খারিজ করা হয়।

রায়কে স্বাগত জানালেন মেয়র মামদানি

আদালতের সিদ্ধান্তের পর নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি রায়টিকে স্বাগত জানান। তাঁর বক্তব্য, ফেডারেল সরকার নগরীর কর্মীদের অভিবাসন বহিষ্কার কার্যক্রমের এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না। স্থানীয় সরকার তার নিজস্ব সম্পদ ও কর্মীদের জনসেবায় নিয়োজিত রাখার অধিকার রাখে।

মামদানি বলেন, নিউইয়র্কের বাসিন্দারা যেন নির্বাসিত হওয়ার ভয়ে সরকারি সহায়তা চাইতে, হাসপাতালে যেতে কিংবা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। নগরীর স্যাংচুয়ারি নীতির মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন সেই আস্থা বজায় রাখতে চায়।

অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, নিউইয়র্কের নীতিমালা জননিরাপত্তা ও অভিবাসন আইন কার্যকরে সমস্যা তৈরি করছে। তবে রায়ের পর বিচার বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

নিউইয়র্কে বসবাসরত অভিবাসী পরিবারগুলোর কাছে বিষয়টি শুধু আইনি বিতর্ক নয়; দৈনন্দিন জীবন ও সরকারি সেবা গ্রহণের সঙ্গেও জড়িত। অভিবাসন-অবস্থার কারণে গ্রেপ্তার বা বহিষ্কারের আশঙ্কা থাকলে কেউ কেউ পুলিশকে অপরাধের খবর জানানো, হাসপাতালের সেবা নেওয়া কিংবা নগরীর বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়তে পারেন।

অভিবাসী অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, স্থানীয় প্রশাসন ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা বজায় থাকলে অপরাধের শিকার ব্যক্তিরা পুলিশের সহযোগিতা চাইতে বেশি উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে, শিশুদের শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং অন্যান্য নাগরিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এই আস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আদালতের রায়কে সব অভিবাসীর জন্য বহিষ্কার থেকে অব্যাহতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারও অভিবাসন-অবস্থা, গ্রেপ্তার, আটক বা বহিষ্কারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ফেডারেল আইন ও ব্যক্তিগত মামলার ওপর নির্ভর করে।

দেশজুড়ে স্যাংচুয়ারি নীতি নিয়ে লড়াই

নিউইয়র্কের এই রায় এমন সময়ে এলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন রাজ্য ও নগরীর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ জোরদার করছে। এর আগে লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো ও মিনেসোটাসহ বিভিন্ন এলাকার স্যাংচুয়ারি নীতির বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের আইনি চ্যালেঞ্জও আদালতে বাধার মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে, ফেডারেল সরকার ২৮৭(g) কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করছে। এই কর্মসূচির অধীনে চুক্তিবদ্ধ স্থানীয় কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট শর্তে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে ভূমিকা রাখতে পারেন। নিউইয়র্ক সিটি এ ধরনের চুক্তিতে যোগ দেয়নি।

সামনে কী?

নিউইয়র্কের স্যাংচুয়ারি নীতি নিয়ে ফেডারেল সরকারের এই মামলা খারিজ হলেও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক শেষ হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আপিল বা অন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিষয়টি আবারও আদালতে উঠতে পারে।

তবে আপাতত এই রায়ের মাধ্যমে নিউইয়র্ক সিটির স্যাংচুয়ারি নীতির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের আনা চ্যালেঞ্জ ব্যর্থ হয়েছে। নগরীর অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি হলেও, ফেডারেল অভিবাসন আইন, আইসিইর ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত বহিষ্কার-প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যায়নি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension