
নাগরিকত্ব ছাড়ার রেকর্ড মার্কিনিদের
কয়েক বছর আগেও বছরে কয়েকশ মানুষ মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তেন। ২০১৪ সাল থেকে প্রতিবছর এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালে ছয় হাজারের বেশি মানুষ মার্কিন নাগরিকত্ব ছেড়েছেন। ২০২৬ সালে এসে এটি নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, মেরুকরণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধংদেহী নীতির কারণে দেশ ছাড়ার এই হিড়িক পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি মোটেই সহজ নয়। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বসবাস করা মার্গট যখন তার মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন লন্ডনের মার্কিন কনস্যুলেটে ১৪ মাসের বেশি অপেক্ষমাণ তালিকা ছিল। সিডনি ও কানাডার বড় শহরগুলোতেও একই অবস্থা। ইউরোপের অনেক শহরে ছয় মাসের অপেক্ষমাণ তালিকা রয়েছে। উপায় না দেখে মার্গটকে বেলজিয়ামের ঘেন্ট শহরের কনস্যুলেটে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, কোনো চাপে পড়ে বা কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে নয়, সজ্ঞানেই তিনি তার জন্মভূমির নাগরিকত্ব ছাড়ছেন।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের নাগরিকত্ব কেন ছাড়তে চাইছেন আমেরিকানরা? এক সময় বিদেশে নিজেদের মার্কিন হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করা আমেরিকানরা মজা করে নিজেদের ‘কানাডিয়ান’ বলতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ, তার নীতি ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো অনেক নাগরিককে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে।
৭৩ বছর বয়সী মেরি ১৯৮৭ সালে কানাডায় পাড়ি জমান। ২০০৬ সালে তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব পান। তিনি বলেছেন, ‘২০১৬ সালের নির্বাচনের রাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই। আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে ট্রাম্প জয়ী হতে যাচ্ছেন।’
ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে বসবাসরত ৫৫ বছর বয়সী পল বলেন, ‘২০২০ সালে ট্রাম্প যখন অ্যামি কোনি ব্যারেটকে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই। আমি গুগলে নাগরিকত্ব ত্যাগের আইনজীবী খুঁজলাম এবং দশ মিনিটের মধ্যে তাদের ই-মেইল করে দিলাম।’ নরওয়ে প্রবাসী ৩৬ বছর বয়সী জোসেফের কথায় আরও চরম হতাশা। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো স্বৈরশাসকের দেশের নাগরিক হতে চাই না। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে সরকার গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কিনা, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’
নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আইনি লড়াইয়ের পর মার্কিন সরকার ফি ২ হাজার ৩৫০ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে ৪৫০ ডলার করলেও, আইনজীবীর খরচ বাবদ ৭ থেকে ১০ হাজার ডলার গুনতে হয়। নাগরিকত্ব ত্যাগের ক্ষেত্রে আইনি সহায়তাকারী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান মুডি’স-এর প্রধান আলেকজান্ডার মারিনো বলেন, ‘বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র (ইরিত্রিয়া ছাড়া) বসবাসের বদলে নাগরিকত্বের ওপর কর আরোপ করে।’
নাগরিকত্ব ছাড়লে বিশেষ করদাতা হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার ঝুঁঁকি থাকে, যার ফলে আজীবন করের বোঝা বইতে হয়। এমনকি সন্তানরাও মার্কিন উত্তরাধিকার করের আওতায় পড়তে পারে। এ ছাড়া, যে কোনো সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা বা সীমান্তে হয়রানির মুখে পড়ার শঙ্কা থাকে।
এত বাধা সত্ত্বেও অনেকেই তাদের সিদ্ধান্তে অটল। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে বসবাসরত ৫৭ বছর বয়সী মাইকেল বলেন, ‘আমি হয়তো আমার জন্মভূমির বিশাল রাস্তা আর পুরনো কিছু খাবার মিস করব। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি যদি আর কখনও আমেরিকায় না ফিরি, তাতে আমার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ থাকবে না।’



