অর্থনীতি ও বাণিজ্যবাংলাদেশ

মূল্যস্ফীতির দৌড়ে পিছিয়ে মজুরি, চাপে শ্রমজীবী মানুষ

মহান মে দিবসের প্রাক্কালে দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা আবারও সামনে নিয়ে আসে এক পুরোনো কিন্তু ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠা প্রশ্ন— মজুরি কি সত্যিই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারছে? পরিসংখ্যান বলছে, উত্তরটি স্পষ্টভাবে ‘না’। আর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে, এই ব্যবধান শুধু সংখ্যার খাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে।

রাজধানীর কাওরান বাজারে কুলি হিসেবে কাজ করা রবিউলের গল্প কিংবা বসিলার প্রবীণ রিকশাচালক আব্দুর রহমানের সংগ্রাম— এগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আয়ের বড় অংশ ঋণ শোধে চলে যায়, আর নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। ফলে আয় বাড়লেও জীবনের মান উন্নত হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) আশঙ্কা করছে, ইরান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ আগামী দিনে শ্রমবাজার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে শ্রমিকরা যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির দ্বিমুখী চাপে বিপর্যস্ত হলেও তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ আকর্ষণে অর্থনীতির অগ্রগতি ও সস্তা শ্রমকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হলেও এর সুফল শ্রমিক পর্যায়ে সমানভাবে পৌঁছায়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। কৃষি, গার্মেন্টস ও প্রবাসী আয়— দেশের এই তিন প্রধান খাত মূলত শ্রমনির্ভর হওয়ায় শ্রমিকরাই অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছেন।

মজুরি বনাম মূল্যস্ফীতি: ‘রিয়েল ইনকাম’ এর সংকট

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। অর্থাৎ, নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত অর্থে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘রিয়েল ইনকাম’—সেটি নেতিবাচক প্রবণতায় রয়েছে।

এই ব্যবধানের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। কারণ তাদের আয়ের অধিকাংশ অংশ ব্যয় হয় খাদ্যপণ্যে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেই তাদের বাজেট ভেঙে পড়ে। ফলে সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, ধারদেনা বাড়ছে, আর অনিশ্চয়তা হয়ে উঠছে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত: সুরক্ষাহীন সংখ্যাগরিষ্ঠ

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আধিপত্য। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ এই খাতে; যা সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ।

এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই শ্রম আইনের সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর বাইরে। তারা শ্রম আদালতের সুবিধা পান না, নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, পরিবহন ও সেবা খাত– সবখানেই তাদের উপস্থিতি থাকলেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগেও এই বিশাল জনগোষ্ঠী কার্যত উপেক্ষিত থেকে গেছে। ফলে শ্রমবাজারে বৈষম্য আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।

ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা

প্রাতিষ্ঠানিক খাতেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের ১০২টি স্বীকৃত শিল্প খাতের মধ্যে মাত্র ৪৭টিতে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কার্যকর রয়েছে। বাকি খাতগুলোতে মজুরি নির্ধারণ হয় মূলত মালিকপক্ষের বিবেচনায়।

ফলে একই ধরনের কাজ করেও ভিন্ন খাতে শ্রমিকরা ভিন্ন মজুরি পাচ্ছেন; যা শ্রমবাজারে অসাম্য বাড়াচ্ছে। যদিও নতুন কিছু খাতকে ন্যূনতম মজুরির আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে, তবুও কাঠামোগত ঘাটতি এখনও স্পষ্ট।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) অর্থ সম্পাদক কাজী মো. রুহুল আমিন বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও জাতীয় মজুরি কমিশন গঠন হয়নি। ১৪২টি খাতের মধ্যে মাত্র ৪৬টি খাতে মজুরি বোর্ড কার্যকর রয়েছে, যার মধ্যে অনেক খাতে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি পুনর্বিবেচনা হয়নি। তিনি ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রম সংস্কার বাস্তবায়ন, রেশন, আবাসন ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিতের দাবি জানান।

শ্রমিকের জীবনে ব্যয়ের চাপ: হিসাব বলছে কী?

শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর আশপাশে একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক ন্যূনতম ব্যয় ২৫ হাজার টাকার বেশি। এর মধ্যে বাসাভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা, খাদ্য ব্যয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, শিক্ষা ব্যয় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, চিকিৎসা ব্যয় ১ থেকে ২ হাজার টাকা, পরিবহন ব্যয় দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং অন্যান্য খরচ ২ থেকে ৩ হাজার টাকা।

এই হিসাব থেকে স্পষ্ট, বর্তমান ন্যূনতম মজুরি দিয়ে একটি শ্রমিক পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে খাদ্য ব্যয় কমাচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে আপস করছে।

পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধি, তবুও স্বস্তি নেই

দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে সাম্প্রতিক মজুরি বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারণ একই সময়ে বাসাভাড়া, খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেছে।

আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক রাহেলা বেগম বলেন, ‘বেতন কিছুটা বাড়লেও বাজারে গিয়ে দেখি সবকিছুর দাম আগের চেয়ে বেশি। মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না।’ একই অভিজ্ঞতা অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও দেখা যায়। অতিরিক্ত সময় কাজ করেও তারা সঞ্চয় করতে পারছেন না।

নির্মাণ শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা

নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের অবস্থা আরও অনিশ্চিত। মানিক নগর এলাকার এক নির্মাণ শ্রমিক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘যেদিন কাজ থাকে সেদিন আয় হয়, না থাকলে কিছুই নেই। কিন্তু খরচ তো থামে না।’ এই অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ছায়া

গত পাঁচ বছরে দেশে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে তা ১০ শতাংশের ওপরে পৌঁছায়। ২০২৫ সালেও এটি ৮-১০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক কারণ, যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে; যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও শ্রমবাজারের ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলছে। রফতানি চাহিদা কমে গেলে প্রথম ধাক্কা লাগে শ্রমিকদের ওপর, বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের।

বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একইসঙ্গে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ঘাটতি দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় শ্রমিকদের চ্যালেঞ্জ বহুগুণ বেড়েছে। তার মতে, বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তি দেশের বড় শক্তি হলেও দক্ষতার ঘাটতি ও তুলনামূলক কম মজুরির কারণে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

পোশাক খাতে দ্বৈত প্রবণতা

দেশের তৈরি পোশাক খাতে একদিকে নতুন কারখানা স্থাপিত হচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো কারখানা বন্ধ হচ্ছে। গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হলেও নতুন করে ২৬৯টি কারখানা উৎপাদনে এসেছে।

ফলে কর্মসংস্থান পুরোপুরি কমে না গেলেও অস্থিরতা বেড়েছে। অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে নতুন কাজে যোগ দিলেও আগের মতো মজুরি বা কাজের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিকরাই দেশের পোশাক শিল্পের মূল শক্তি। তাদের কল্যাণে নারায়ণগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বিভিন্ন অঞ্চলে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং চিকিৎসা সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; যা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের কল্যাণে আন্তরিক হলেও সীমিত সক্ষমতার কারণে সব চাহিদা পূরণ সম্ভব হয় না।

নীতি ও বাস্তবতার ফারাক

শ্রমিক নেতাদের মতে, শুধু মজুরি বৃদ্ধি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি।

তাদের দাবি, শ্রমিকদের জন্য একটি কার্যকর ‘লিভিং ওয়েজ’ কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে মজুরি নির্ধারণ হবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য পরিচয়ভিত্তিক কার্ড চালু করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির এই বৈপরীত্য নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি আরও প্রকট হয়েছে। বাংলাদেশে মজুরি কিছুটা বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় বাড়ছে না; যা আঞ্চলিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সমন্বিত নীতির প্রয়োজন

সামগ্রিক বিশ্লেষণ বলছে, মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের প্রকৃত আয় যদি ক্রমাগত কমতে থাকে, তবে তা ভোগব্যয়, সঞ্চয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা তিনটি বিষয়ে জোর দিচ্ছেন– প্রথমত, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বিত মজুরি কাঠামো প্রণয়ন; দ্বিতীয়ত, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা; তৃতীয়ত, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।

উল্লেখ্য, মে দিবসের মূল চেতনা ছিল শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই লক্ষ্য এখনও অনেক দূরে। বরং নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে।

মজুরি বাড়লেও যদি তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল না রাখে, তবে শ্রমিকের জীবনে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই এখন প্রয়োজন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর ও সমন্বিত নীতি– যা শ্রমিকের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension