
দেশবাসীর দাবি, ইউনূস সরকারের ১৮ মাসের দুর্নীতি তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন করা হোক: আসিফ নজরুলের দুর্নীতির জীবন চক্র
আসিফ নজরুল ওরফে নজরুল ইসলাম। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ সময় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অযোগ্যতার বিস্তর অভিযোগ ওঠে। কিন্তু আসিফ নজরুলের জীবনচক্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার জীবনের প্রতিটি ধাপেই আছে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং দুর্নীতি।
সারাজীবন তিনি রং বদল করে গেছেন, করেছেন প্রতারণা এবং জালিয়াতি। তার প্রতারণা এমন যে নিজের নামটি পর্যন্ত তিনি পরিবর্তন করেছেন।
আসিফ নজরুলের আসল নাম নজরুল ইসলাম। এ নামেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন।
আইন বিভাগের মাঝারি মানের ছাত্র ছিলেন নজরুল।
আসিফ নজরুলের ব্যাচে সবচেয়ে মেধাবী ছিলেন শামসুদ্দিন আহমেদ। অনার্সে ফার্স্ট হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শামসুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেননি। প্রয়াত এরশাদুল বারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে যোগ দেন। আসিফ নজরুল অলৌকিকভাবে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে যান। এরশাদুল বারীর সঙ্গে নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সূত্র ছিল আদর্শিক। এলএলএমে (আইনে মাস্টার্স) এরশাদুল বারী আসিফ নজরুলকে একরকম জোর করেই প্রথম শ্রেণির দেন। বেশ কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে নজরুলকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বানিয়ে দেন। শিক্ষক রাজনীতির কূটকৌশলে বারী শামসুদ্দিন বাদ দিয়ে নজরুল ইসলামকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে সক্ষম হন। কিন্তু শিক্ষক হওয়ার পর এই এরশাদুল বারির সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেন আসিফ নজরুল। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ৭১ এর ঘাতক দালাল এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনে বারীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন নজরুল। এটাই আসিফ নজরুল।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন আসিফ নজরুল। মিনারে মাহমুদের বিচিনতা পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। পরে মিনার মাহমুদের সঙ্গেও করেন প্রতারণা। এরপর তৎকালীন জাসদ নেতা (পরবর্তীতে বিএনপি নেতা) শাজাহান সিরাজের মালিকানাধীন লড়াই নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। এখানে নারী ঘটিত কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর আসিফ নজরুল যোগ দেয় সাপ্তাহিক বিচিত্রায়।
সাংবাদিকতায় আসিফ নজরুলের আসল গুরু ছিলেন শাহরিয়ার কবির। শাহরিয়ার কবির রীতিমতো জোর করে আসিফ নজরুলকে বিচিত্রায় চাকরি পাইয়ে দেন।
সুযোগ বুঝে, শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আসিফ নজরুল ভুল করেনি। চরম অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে বিবেকের বন্দি শাহরিয়ার কবির। উপদেষ্টা হওয়ার পর অর্থের বিনিময়ে গান বাংলার তাপসসহ বহু মানুষের জামিন করালেও শাহরিয়ার কবিরের জন্য তার শিষ্য আসিফ নজরুল কিছুই করেননি। আসিফ নজরুলের ভাবসাব দেখে মনে হয়, শাহরিয়ার কবিরকে চেনেন না। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কথা আমরা সবাই জানি। এখানে আসিফ নজরুলের তৎপরতা কারও অজানা নয়। কিন্তু পরে দেখা গেল আসিফ নজরুল আসলে ঘরের শত্রু বিভীষণ। আসিফ নজরুল একাত্তরের ঘাতক দালাল জাতীয় নির্মূল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তিনিই প্রথম যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি তোলেন। এখনো আসিফ নজরুল সেই দাবিতে অটল? না। তার আদর্শ এবং নীতি বদল হয় ক্ষণে ক্ষণে। যে আদর্শে যখন লাভ সেই আদর্শই তিনি ধারণ করেন। এজন্য কখনো তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে কেঁদে টকশোতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, আবার বিএনপির জোয়ারে এসে বেগম জিয়ার স্তুতিতে গলা ফাটাতে লজ্জাবোধ করেন না। এই আসিফ নজরুলই প্রথম আলোর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, ২১ আগস্টের দায় বিএনপি এড়াতে পারে না। এটাই আসিফ নজরুল। যখন যার তখন তার। যে তাকে বিশ্বাস করবে, সেই ঠকবে।
আসিফ নজরুলের দাম্পত্য জীবনও প্রতারণা আর স্বার্থের জালে বন্দি। প্রথম বিয়ে করেছিলেন বিদেশে পিএইচডি করার সময়। তখন তার ক?্যারিয়ারের জন্য বিয়েটা দরকার ছিল। দেশে ফিরে সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেন। এ সময় রোকেয়া প্রাচী বড় তারকা। মাটির ময়না করে তিনি আলোচিত। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। রোকেয়া প্রাচীকে বিয়ে করে তিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলে রোকেয়া প্রাচীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এর মধ্যেই আসিফ নজরুল প্রাচী দম্পতির ঘরে আসে একটি কন্যা সন্তান। কিন্তু তাতে কী, আসিফ নজরুল পরকীয়াতে জড়িয়ে পড়েন হূমায়ুন আহমেদ কন্যা শিলা আহমেদের সঙ্গে। শিলা তখন বিবাহিত এবং সন্তানের মা। কিন্তু আসিফ নজরুলের পক্ষে সব সম্ভব। একসময় রোকেয়া প্রাচী সব জানলে তাদের ডিভোর্স হয়। তার দাম্পত্যজীবনও তাই প্রতারণার গল্প।
এবার আসা যাক, উপদেষ্টা হওয়ার পর তার দুর্নীতি প্রসঙ্গে। গত ২৯ এপ্রিল ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আসিফ দাবি করেছেন, তিনি দুর্নীতি করেননি। সবই নিয়ম মেনে করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা।
আসিফ নজরুলের আমলে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি। ঘুষের বিনিময়ে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চারবার বদলি করা হয়েছে। আঠারো মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। নিয়ম মেনে যদি বদলি হয়ে থাকে তাহলে একজনকে বারবার বদলি করা হলো কেন? আসিফ নজরুল তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, মনীষাকে তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছিল দেখা যাক। ২৯ সেপ্টেম্বর সাব-রেজিস্ট্রার মনীষা রায়কে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। এর চার মাস পর ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মনীষাকে হরিপুর থেকে বদলি করা হয় দিনাজপুরের হাকিমপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে হাকিমপুরে যোগদানের আগের দিন মনীষাকে আবার বদলি করা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। কেউ কি বারবার বদলি হতে চাইবে। এরকম একটা নয়, অনেক উদাহরণ রয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল সাব-রেজিস্ট্রার রেহানা পারভীনকে বরিশালের রহমতপুর থেকে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় বদলি করা হয়। তবে ‘তদবিরের মাধ্যমে’ মাত্র দুই দিনের মধ্যে রেহানা ১১ এপ্রিল বদলি নিয়ে বরিশালের মুলাদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সাব-রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্য্যকে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বদলি করা হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। তিনিও দুই দিন পরই বদলি নিয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় চলে আসেন। ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আবদুল আরিফকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বদলি করা হয়। যোগদানের আগের দিন ৬ অক্টোবর এ বদলি স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এসব কি স্বাভাবিক বদলি?
নিম্ন আদালতের বিচারক এবং সরকারি আইনজীবী নিয়োগেও আসিফ নজরুল তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছেন। আসিফ নজরুল সরকারি আইনজীবী নিয়োগে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন। তার দেড় বছরের শাসনকালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের বেতন ভাতা দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় করা হয়েছে শুধু আসিফ নজরুলের নিজের লাভের জন্য। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে এখন ১০৩ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও ২৩০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) রয়েছেন। এত বেশি সংখ্যক আইন কর্মকর্তা এর আগে কখনো ছিল বলে জানা যায়নি। তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। এ দুই পদে এত বেশি সংখ্যক নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনবিশেষজ্ঞরা। আসিফ নজরুলের কাছে এর কোনো জবাব আছে? বিচারকাজ পরিচালনা করতে রাষ্ট্রপক্ষে সাধারণত সর্বোচ্চ ১০ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু আসিফ নজরুল ব্যতিক্রম ঘটান ঢাকার দুটি আদালতে। তিনি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৮৪ জন এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ৬১ জন বিভিন্ন পদমর্যাদার সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলেন। যদিও এর আগে মহানগর দায়রা জজ আদালতে চার এবং জেলা দায়রা জজ আদালতে ৯ জন আইন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ চারজনের স্থলে ৮৪ এবং ৯ জনের স্থলে ৬১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আসিফ নজরুলের শাসনামলে ঢাকার আদালতগুলোয় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করতে ৬৫৯ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিল আইন, বিচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ। এসব দুর্নীতির কোনো জবাব নেই আসিফ নজরুলের কাছে।
আসিফ নজরুল নিম্ন আদালতেও বিচারক দিয়েছেন দুর্নীতির মাধ্যমে। আদালত পাড়ায় এদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। আসিফ নজরুল মনোনীত এই বিচারকরা এখন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন আইনজীবীরা। আসিফ নজরুল দাবি করেছেন, ইস্কাটনে মেয়ের নামে বাড়ি নেই। তাহলে রোকেয়া প্রাচী তার আয়কর নথিতে কেন উল্লেখ করলেন, স্বামীকর্তৃক প্রাপ্ত। রোকেয়া প্রাচী কেন এবং কীভাবে নিরাপদে বিমানবন্দর দিয়ে ভারতে গেলেন?
আসিফ নজরুল, অসত্য বলায় দারুন পটু। ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে চাকরি করে এমন একটা অসত্য তথ্য তিনি রীতিমতো সত্য বলে প্রচার করেছিলেন। কাজেই তিনি যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এজন্যই একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা উচিত। যেখানে আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। তা হলেই বোঝা যাবে কে কত সাধু।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্য জানতে ৩০ এপ্রিল তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর অভিযোগের বিষয়ে তাঁর হোয়াটস অ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সৌজন্যে বাংলাদেশ প্রতিদিন



