আন্তর্জাতিক

হরমুজ প্রণালি খুলতে তেহরানের তাগিদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান বর্তমানে ‘ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে’ রয়েছে এবং তারা দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, নেতৃত্ব নিয়ে চরম সংকটে থাকা ইরান নিজেদের পরিস্থিতি সামাল দিতেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই বার্তা দিয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ইরান এ দাবি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি প্রতিনিধি আমির সাইদ ইরাভানি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা’ প্রয়োজন। দুই দেশের এই বিপরীতমুখী অবস্থান এবং পাল্টাপাল্টি শর্তের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, অর্থনীতি ও যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক নতুন মাত্রা। খবর দ্য গার্ডিয়ান ও সিএনএনের।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে আপাতত পারমাণবিক আলোচনা স্থগিত রাখার যে নতুন প্রস্তাব ইরান দিয়েছে, তাতে ট্রাম্প প্রশাসন সন্তুষ্ট নয়। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের তেল উৎপাদন শিগগিরই ধসে পড়বে এবং দেশটিতে পেট্রলের চরম সংকট দেখা দেবে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর ইরান নিজেদের ইস্পাত শিল্প রক্ষায় ২৬ এপ্রিল থেকে সব ধরনের ইস্পাত পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে।

এসব উত্তেজনার মধ্যেই একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। রুশ ধনকুবের আলেক্সেই মোর্দাসোভের মালিকানাধীন ৫০ কোটি ডলার মূল্যের সুপারইয়ট ‘নর্ড’ দুবাইয়ে মেরামত শেষে নির্বিঘ্নে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইন মেনে চলা রাশিয়ার পতাকাবাহী এই নৌযানের চলাচলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানÑ কেউই বাধা দেয়নি।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে এই সংঘাত। জাতিসংঘে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানকে সহসভাপতি করার তীব্র বিরোধিতা করে মার্কিন কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার ইয়াও একে চুক্তির প্রতি ‘অপমান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর জবাবে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) নিযুক্ত ইরানের প্রতিনিধি রেজা নাজাফি মার্কিন বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছেন। সেন্ট পিটার্সবার্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘অত্যধিক দাবিকে’ দুষেছেন।

এর মাঝে অপ্রত্যাশিত এক ঘোষণায় ১ মে থেকে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ধারণা করা হচ্ছে, আরও বেশি তেল ও গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যেই তাদের এই সিদ্ধান্ত।

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব ঠিক করতে গতকাল মঙ্গলবার জেদ্দায় বৈঠকে বসেন উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট জিসিসির নেতারা। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এই সংকটে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রশংসা করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি কখনই বন্ধ করা উচিত হয়নি এবং সমস্যা সমাধানে কূটনীতির বিকল্প নেই। এ ছাড়া রাজনৈতিক রদবদল ঘটেছে ইরাকেও; মার্কিন চাপে ইরানঘেঁষা নুরি আল-মালিকিকে বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী আলী আল-জাইদিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করেছে দেশটি।

এদিকে ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের ঘন্দোরিয়েহ, সাফাদ আল-বাতিখ, খিরবেত সিলমসহ ১৬টি শহর ও গ্রামের বাসিন্দাদের দ্রুত সিডন এলাকায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার জানিয়েছেন, লেবাননের ভূখণ্ড দখলের কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। অন্যদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সরাসরি হিজবুল্লাহর দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, যারা লেবাননকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছে, তারা ‘দেশদ্রোহী’।

ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে দক্ষিণ লেবাননের প্রকৃতি ও পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তাকে ‘ইকোসাইড’ বা ‘বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির পরিবেশমন্ত্রী। এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হামলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর বনভূমি ও ২ হাজার ১৫৪ হেক্টর ফলের বাগান ধ্বংস হয়েছে। মাটিতে বিপজ্জনক মাত্রায় ফসফরাস মিশেছে এবং কৃষি ও অবকাঠামো মিলিয়ে মোট আড়াই হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension