নিউ ইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

৯/১১-এর ২৫ বছর: আগুন নেভেনি, স্মৃতিও মুছে যায়নি

স্টেটেন আইল্যান্ডে FDNY পরিবারের অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা—সন্ত্রাসের দিনের শহীদদের পাশাপাশি স্মরণ করা হলো পরবর্তী দুই দশকের অসুস্থতায় হারানো অগ্নিনির্বাপকদের

হোসনেআরা চৌধুরী :

একটি দিন বদলে দিয়েছিল নিউইয়র্ককে, বদলে দিয়েছিল আমেরিকাকে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এর সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে স্টেটেন আইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এক হৃদয়স্পর্শী স্মরণানুষ্ঠানে আবারও ফিরে এলো সেই দিনের বেদনা, সাহস ও আত্মত্যাগের গল্প।

বুধবারের অনুষ্ঠানে FDNY-এর পরিবার, কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিনির্বাপক এবং স্বজনেরা একত্রিত হন ৯/১১-এর হামলায় নিহতদের পাশাপাশি পরবর্তী বছরগুলোতে ৯/১১-সংশ্লিষ্ট অসুস্থতায় মৃত্যুবরণকারী সহকর্মীদের স্মরণে। অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধ ও শ্রদ্ধার আবহ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকাজুড়ে।

একটি নিউইয়র্ক সিটি ফায়ারবোটের জল-অভিবাদন এবং দুটি ল্যাডার ট্রাকে টানানো বিশাল মার্কিন পতাকা অনুষ্ঠানে সৃষ্টি করে গভীর আবেগঘন পরিবেশ। স্টেডিয়ামের বাইরের বেড়াজুড়ে ৯/১১-এর দিন নিহত এবং পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব পালনকালে সৃষ্ট অসুস্থতায় মারা যাওয়া অগ্নিনির্বাপকদের নামের পাশে টাঙানো হয় পতাকা।

স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নিজস্ব একেকটি বেদনাময় গল্প।

তাদের একজন মিয়া ওয়েলশ। তাঁর বাবা রবার্ট ওয়েলশ তৃতীয় ২০২৩ সালের আগস্টে ৯/১১-সংশ্লিষ্ট গ্লিওব্লাস্টোমায় মারা যান। হামলার পর তিনি গ্রাউন্ড জিরোতে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। মিয়ার মা-ও সেদিন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ টাওয়ারে কর্মরত ছিলেন; সৌভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি কাজে পৌঁছাতে দেরি করেছিলেন।

আরেক পরিবারের গল্পও অনুষ্ঠানে ভারী করে তোলে পরিবেশ। FDNY-এর ‘Trench Dogs’ নামে পরিচিত ব্রুকলিন হাইটসের ইউনিট ২২৪-এর সদস্য থমাস গ্লেন স্মিথ সিনিয়র ৯/১১-সংশ্লিষ্ট ফুসফুসের ক্যানসারে চলতি বছরের মার্চে মারা যান। তাঁর ছেলে থমাস গ্লেন স্মিথ জুনিয়র বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ১১ সেপ্টেম্বরের সেই যাত্রাপথে তাঁর বাবা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানে শত শত FDNY পরিবারের সদস্যের পাশাপাশি কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিনির্বাপকরা অংশ নেন। তাঁদের স্মরণে উচ্চারিত হয় শুধু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মৃত্যুগুলো নয়—পরবর্তী ২৫ বছর ধরে চলতে থাকা এক নীরব মৃত্যুযাত্রার কথাও।

FDNY কমিশনার লিলিয়ান বনসিগনোরে পরিবারগুলোর উদ্দেশে বলেন, একই দিনে এতজনকে হারানোর পর বছরের পর বছর ধরে অসুস্থতার কারণে সহকর্মীদের হারানোর যে বেদনা, তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

৯/১১-এর মৃত্যু শুধু ২০০১-এ থেমে থাকেনি

২৫ বছর পরও ৯/১১-এর ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। গ্রাউন্ড জিরোর ধ্বংসস্তূপ ও বিষাক্ত পরিবেশে উদ্ধার, উদ্ধার-পরবর্তী পরিষ্কার এবং পুনরুদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া বহু প্রথমসারির কর্মী পরবর্তী বছরগুলোতে ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত হন।

সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১-সংশ্লিষ্ট অসুস্থতায় মৃত্যুবরণকারী FDNY সদস্যের সংখ্যা এখন ৪৫৩-এ পৌঁছেছে—যা ২০০১ সালের হামলায় নিহত ৩৪৩ FDNY সদস্যের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে ১২ হাজারের বেশি FDNY সদস্যকে অন্তত একটি ৯/১১-সংশ্লিষ্ট অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। (New York Post⁠)

অর্থাৎ, ৯/১১-এর ইতিহাস কেবল ধ্বংস হওয়া দুটি টাওয়ার, হারিয়ে যাওয়া প্রায় তিন হাজার প্রাণ কিংবা সেই দিনের আতঙ্কের ইতিহাস নয়। এটি এমন এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস, যার ছায়া আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন অসংখ্য পরিবার।

স্টেটেন আইল্যান্ডের স্মরণানুষ্ঠান শেষ হয়েছে একটি অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে—যারা ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এ প্রাণ হারিয়েছেন এবং যারা পরবর্তী বছরগুলোতে সেই দিনের দায়িত্ব পালনের মূল্য দিয়ে জীবন দিয়েছেন, তাদের কাউকেই কখনো ভুলে যাওয়া হবে না।

Never Forget—শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি এক প্রজন্মের কাছে রেখে যাওয়া ইতিহাস, দায়বদ্ধতা এবং মানবিক অঙ্গীকার।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension