নিউ ইয়র্ক

নিউইয়র্কের আবাসন সংকটে ‘জায়নিস্ট’ তকমা: ভাড়ার ক্ষোভ থেকে ইহুদিবিদ্বেষের বিতর্ক

আবাসন অধিকার আন্দোলনে ইসরায়েল ও ‘জায়নিস্ট’ স্বার্থের প্রসঙ্গ, উসকে উঠছে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক

হোসনেআরা চৌধুরী: নিউইয়র্ক সিটির তীব্র আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের ঘাটতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক প্রচারণায় ‘জায়নিস্ট’ ও ইসরায়েলকে দায়ী করার প্রবণতা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, আবাসনসংক্রান্ত বাস্তব সমস্যার সঙ্গে ইহুদি সম্প্রদায় বা ‘জায়নিস্ট’ পরিচয়কে এক করে দেখানোর ফলে রাজনৈতিক প্রতিবাদ কোথাও কোথাও ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্যের দিকে যাচ্ছে।

ম্যানহাটনের চেলসি এলাকায় আবাসন পুনর্নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে বিতরণ করা কিছু পোস্টার ও প্রচারপত্রে ‘জায়নিস্ট’ অর্থ, ‘জায়নিস্ট’ দখল এবং রথসচাইল্ডদের মতো পুরনো ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রতত্ত্বের উল্লেখ পাওয়া গেছে। এসব প্রচারণায় আবাসন অধিকার ও ভাড়াটিয়াদের স্বার্থের দাবির সঙ্গে ইসরায়েল ও জায়নিস্ট রাজনীতির সম্পর্কও তুলে ধরা হয়।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন নিউইয়র্কে আবাসন ব্যয় ও সাশ্রয়ী আবাসনের সংকট রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক আন্দোলনও শহরের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। ফলে স্থানীয় আবাসন সমস্যা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে একসূত্রে দেখানোর প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বৃহৎ আবাসন প্রকল্প ঘিরে ক্ষোভ

ফুলটন ও এলিয়ট-চেলসি হাউজেসকে কেন্দ্র করে একটি বড় পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনাই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। পরিকল্পনায় বিদ্যমান সাশ্রয়ী আবাসন ইউনিট সংস্কার ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক নতুন আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে।

তবে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ, বাসিন্দাদের স্থানান্তর এবং ভবিষ্যতে উচ্ছেদের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীর উদ্বেগ রয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই বিভিন্ন প্রতিবাদ ও প্রচারণার সূত্রপাত। তবে এসব স্থানীয় আবাসন সমস্যার সঙ্গে ‘জায়নিস্ট’ শক্তি বা ইহুদি পরিচয়কে যুক্ত করা নিয়ে তীব্র সমালোচনা দেখা দিয়েছে।

রাজনীতিতেও ‘জায়নিস্ট’ প্রসঙ্গ

নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিসরেও আবাসন সংকটের আলোচনায় ‘জায়নিস্ট’ স্বার্থ, ইসরায়েলপন্থী সংগঠন এবং রিয়েল এস্টেট খাতকে একই আলোচনায় আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী ও প্রার্থী আবাসন ব্যয়, করপোরেট বাড়িওয়ালা এবং ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে সম্পর্কের অভিযোগ তুলেছেন। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সংগঠন বা নির্দিষ্ট রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা বৈধ রাজনৈতিক অধিকার হলেও সেটিকে একটি জাতি, ধর্ম বা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাধারণীকরণ করা বিপজ্জনক।

ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ইতিহাসবিদ ও ইহুদি ইতিহাসের গবেষকদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন, আবাসন, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় যখন ‘জায়নিস্ট’, ‘রথসচাইল্ড’ বা ইহুদিদের ঘিরে পুরনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ব্যবহার করা হয়, তখন তা নিছক রাজনৈতিক সমালোচনার সীমা অতিক্রম করে ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্যে পরিণত হতে পারে।

তাদের মতে, নিউইয়র্কের আবাসন সংকটের পেছনে রয়েছে বহু জটিল কারণ—ভাড়ার উচ্চমূল্য, জমির মূল্য, আবাসন সরবরাহের ঘাটতি, নগর পরিকল্পনা, নির্মাণ ব্যয় এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত সীমাবদ্ধতা। এসব সমস্যার জন্য কোনো একটি জাতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয়কে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা বাস্তব সমস্যার সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

আবাসন সংকটের সমাধানই হোক মূল আলোচনার বিষয়

নিউইয়র্কে সাশ্রয়ী আবাসনের সংকট নিঃসন্দেহে একটি গভীর নাগরিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। ভাড়াটিয়াদের অধিকার, নতুন সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আবাসন নীতি নিয়ে জোরালো রাজনৈতিক বিতর্কের প্রয়োজন রয়েছে।

তবে সেই বিতর্ক যেন কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা কিংবা ষড়যন্ত্রতত্ত্বে রূপ না নেয়—এ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

আবাসন সংকটের প্রকৃত কারণ ও কার্যকর সমাধান নিয়ে আলোচনা যত বেশি তথ্যভিত্তিক হবে, ততই রাজনৈতিক বিতর্ক সুস্থ থাকবে। অন্যদিকে বাস্তব নাগরিক সমস্যার সঙ্গে কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘দোষী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা নিউইয়র্কের বহুত্ববাদী সমাজে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension