প্রধান খবরবাংলাদেশরাজনীতি

অর্ধশতাধিক আসনে প্রার্থিতা হারাতে বসেছে বিএনপি

রূপসী বাংলা ঢাকা ডেস্ক রিপোর্ট:  আইনি জটিলতার কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে প্রার্থিতা হারাতে বসেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এরই মধ্যে অনেকের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এছাড়া অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। মঙ্গলবার হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে প্রার্থিতা হারান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ।

আজ ১৮ ডিসেম্বর  মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নির্ধারণ করে দেওয়া হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিল সংক্রান্ত আদেশের পর এ কথা জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

তিনি বলেছেন, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে দুই বছরের অধিক সময়ের জন্য কারাদন্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় আরও অনেকের প্রার্থিতা এরইমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বাতিল হয়েছে।

জানা গেছে, যেসব মামলায় দন্ড হয়েছে তার বেশিরভাগই ওয়ান-ইলেভেনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা। আসামিরা সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগের সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাকর্মীরা। বর্তমানে সেসব মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে প্রার্থিতা হারাচ্ছেন ধানের শীষের অনেক প্রার্থী।

এদিকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামীর ২২ প্রার্থীর ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থিতা বাতিল করতে কমিশনে একটি আবেদন করেছে তরিকত ফেডারেশন। তিন দিনের মধ্যে এই আবেদনের নিষ্পত্তি করতে আজ মঙ্গলবার ১৮ ডিসেম্বর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এছাড়া ধানের শীষ প্রতীকের এই ২২ জনের প্রার্থিতা কেন বাতিল করা হবে না,  তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন উচ্চ আদালত।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মতে,আদালতের এই রুল সঠিক। তাদের প্রার্থিতা বাতিল হওয়াই যৌক্তিক হবে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকারের উপজেলা চেয়ারম্যান পদকে লাভজনক পদ বলেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গতকাল সোমবার (১৭ ডিসেম্বর) এক মামলার আদেশে এ কথা বলেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ফলে মনোনয়নের আগে স্থানীয় সরকারের উপজেলা চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ না করায় প্রায় ৩০ জনের প্রার্থিতা বাতিলের পথে।

এছাড়া ঋণখেলাপির দায়ে ধানের শীষের অনেক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের পথে।

জামায়াতের ২২ প্রার্থী ছাড়া ধানের শীষের বাদ পড়তে যাওয়া অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন – ঢাকা-১ আসনের খন্দকার আবু আশফাক, ঢাকা-২০ আসনের তমিজ উদ্দিন, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খান রিতা, বগুড়া-৩ আসনের আবদুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া-৭ আসনের মোরশেদ মিল্টন এবং চাঁদপুর-৪ আসনের এম এ হান্নান,সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা এবং জামালপুর-১ আসনে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

তমিজ উদ্দিনের ঢাকা-২০ আসনে বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণায় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বেনজির আহমেদ। শুনানি শেষে ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তমিজ উদ্দিনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণায় ইসির সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়। এ কারণে আটকে যায় তমিজ উদ্দিনের নির্বাচনে অংশ নেওয়া।

এই আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করেন তমিজ উদ্দিন। চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিত করেন। ফলে তমিজ উদ্দিনের নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ খুলে যায়। তবে শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগ চেম্বার বিচারপতির দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে তমিজের উদ্দিনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ আবার আটকে যায়।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খান রিতা ঋণখেলাপি হওয়ার পরও তার মনোনয়নপত্র গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেয় নির্বাচন কমিশন। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে সোনালী ব্যাংক। হাইকোর্ট রিতার মনোনয়নপত্র স্থগিত করেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ কোনও আদেশ (নো অর্ডার) দেয় নি। ফলে আগামি নির্বাচনে রিতাও অংশ নিতে পারছেন না।

বগুড়া-৩ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আবদুল মুহিত তালুকদার হাইকোর্টে রিট করেন। এরপর গত ৯ ডিসেম্বর তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে ইসিকে নির্দেশ দেয়া হয়। এই আদেশ স্থগিত চেয়ে ইসি আবেদন করে আপিল বিভাগে। শুনানি নিয়ে ১১ ডিসেম্বর চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগ চেম্বার বিচারপতির দেয়া স্থগিতাদেশ বহাল রাখে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার আবু আশফাকের পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার আগেই তিনি ঢাকা-১ আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করলেও আপিলে ফিরিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন।তবে কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন বিকল্পধারার জালাল উদ্দিন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন। সঙ্গে ছিলেন শামীম আহমেদ মেহেদী ও আব্দুল কাইয়ুম।

আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিল।কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ওই সিদ্ধান্ত হাইকোর্ট স্থগিত করে দিয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত স্থগিত হওয়ায় আশফাক আপাতত আর নির্বাচন করতে পারছেন না।’

মোরশেদ মিল্টন বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপির এই প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করেছে হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি জে. বি.এম. হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। তার সঙ্গে ছিলেন সেলিনা আক্তার।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মিল্টন। কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে পদত্যাগ না করায় তার মনোনয়ন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান নির্বাচন কমিশন থেকে।

তবে উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ সঠিকভাবে হয় নি দাবি করে রিট করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ফেরদৌস আরা খান।

চাঁদপুর-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার আদেশ স্থগিত করে বিচারপতি জে.বি.এম. হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের বেঞ্চ।

এম এ হান্নান বেসরকারি ব্যাংক মার্কেন্টাইলের ভাইস চেয়ারম্যান। তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অভিযোগ ছিল। তবে গত ২ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাই শেষে মনোনয়নপত্রটি বৈধ ঘোষণা করেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা।

তবে এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে সোনালী ব্যাংক। আর শুনানি শেষে হান্নানের মনোনয়নপত্রটি স্থগিত করেন আদালত।

সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সিদ্ধান্ত গত ১৩ ডিসেম্বর স্থগিত হয় হাইকোর্টে। ওই আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির ইয়াহহিয়া চৌধুরীর আবেদনে এই সিদ্ধান্ত আসে। আরপিও অনুযায়ী সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার তিন বছর পর সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার বিধান আছে। তবে লুনা ছয় মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রারের পদ থেকে অব্যাহতি নেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা লুনার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর ইয়াহহিয়া চৌধুরীর আইনজীবী নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন।কিন্তু নির্বাচন কমিশন লুনার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে।

একই দিন জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের মনোনয়ন স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। ওই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের করা রিটের শুনানি শেষে এই আদেশ আসে।

রশিদুজ্জামান মিল্লাত দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত। এ কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। কিন্তু তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পান।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension