
আধিপত্যের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-চীন
বিশ্বে করোনা মহামারীর মধ্যেও থেমে নেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক আধিপত্যবাদিতার লড়াই। করোনা প্রতিরোধী টিকার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থেকে শুরু করে সার্বিক স্তরে এই আধিপত্যের খেলা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আবারও আমেরিকাকে বৈশ্বিক ক্ষমতা বলয়ের কেন্দ্রে আনতে চাইছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং চাইছেন বাণিজ্য ও কূটনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করতে। আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চাইছেন ধীরে ধীরে ইউরোপকে কব্জা করতে। এই তিন নেতার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলো পক্ষে-বিপক্ষে অংশগ্রহণ করছে।
চীন অনেকদিন থেকেই জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। শিনজিয়াংয়ে উইঘুর গণহত্যা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে চীনের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ৮০টি দেশ। এর মধ্যে প্রভাবশালী অনেক মুসলিম দেশও রয়েছে। চীনের এই আধিপত্যবাদিতা টের পেয়ে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্প শেষমেশ ক্ষমতায় টিকতে পারেননি।
চিনপিং এবং পুতিন দুজনই সাংবিধানিকভাবে আজীবনের জন্য প্রেসিডেন্ট নন। কিন্তু বাস্তবে তারা কবে ক্ষমতা ছাড়বেন তা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। ধারণা করা হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে বিশ্ব দরবারে হাজির থাকবেন এই দুই বিশ্ব নেতা। এই দুই সুপারপাওয়ার একজোট হয়ে চলতি শতাব্দীর ভূ-রাজনীতির গতিধারা নির্ধারণ করতে চান সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। এর ফলে প্রতি বছরই তাদের ক্ষমতা বেড়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেই তারা এগিয়ে যেতে চান সামনের দিনগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রে একজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ আট বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন। ফলে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি যে কোনো সময় বদলে যেতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে পুতিন ও চিনপিং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যে আইনে স্বাক্ষর করেছেন তাতে তিনি ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। তার বয়স এখন ৬৮ বছর। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন তিনি। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনের পর পুতিনই দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসক। অন্যদিকে চিনপিংয়ের বয়স এখন ৬৭ বছর। ২০১২ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও চীন এখন একটি বড় পরাশক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চীন নিজেকে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক খাতেও যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে চীন। চিনপিং কঠোরহস্তে দেশ শাসন করছেন। ভিন্নমত দমনের পাশাপাশি তিনি হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়েছেন। তাইওয়ানের স্বাধীনতাকেও হুমকিতে ফেলেছেন তিনি। চিনপিংয়ের ক্ষমতার মেয়াদের সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। তার দৃশ্যত কোনো উত্তরসূরি নেই। এর ফলে তিনি বহুদিন চীন শাসন করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
৭৮ বছর বয়সী বাইডেন পুতিন ও জিনপিং উভয় নেতার বিরুদ্ধেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি নজিরবিহীনভাবে পুতিনকে খুনি বলে মন্তব্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থা ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে চীনই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৃহত্তম হুমকি। বস্তুত বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে চীনের উত্থান ঠেকানো।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাইডেনের নীতি চীন ও রাশিয়ার ঐক্য আরও সুদৃঢ় করতে পারে। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছে পেইচিং ও মস্কো। যুক্তরাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যে বড় খেলোয়াড় হতে চায়। আগে রাশিয়া এক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে ছিল চীন।



