
আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস আজ: অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের কারণে হুমকিতে সুন্দরবনের বাঘ
দেশে বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা দিন দিন বড় হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাঘ হত্যা করে এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের কাছেও অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। এসব কারণে কমছে বাঘের সংখ্যা। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার রোধকেই বাঘ সংরক্ষণের মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের একটি বড় অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের তালিকায় রয়েছে বাঘ, কুমির, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ ও হাঙর। চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চাহিদা থাকায় সুন্দরবনের দিকে নজর রয়েছে পাচারকারী চক্রের। এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস।
১৯৬০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রায় ২০০টি বাঘ হত্যার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। এ সময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গসহ শতাধিক বাঘের চামড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জব্দ করলেও এর নেপথ্যের চক্র ধরা পড়েনি। বন বিভাগের কাছেও এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
বাংলাদেশের বাঘ সংরক্ষণে যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে বাংলাদেশে বাঘের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবন এখন হুমকিতে। পোচিং অর্থাৎ অবৈধ শিকারের কারণে বাংলাদেশের বাঘ এখনো বড় ধরনের ঝুঁকিতে। দীর্ঘদিন ধরে চোরা শিকারিরা শিকার করে চামড়া, হাড়সহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার করে আসছে। এখন পর্যন্ত বাঘ সংরক্ষণের মূল চ্যালেঞ্জই বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার রোধ।
দীর্ঘ সময় সুন্দরবনের অপরাধ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছেন অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁতসহ অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সে কারণে চোরা শিকারিরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বাঘ শিকার করছে। বনদস্যুরাও এখন প্রাণী শিকার করছে। সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঘের টিকে থাকার জন্য খুবই কঠিন।’
বন্যপ্রাণী আইনের ৩৬ ধারায় বলা হয়েছে, বাঘ শিকার বা হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন-অযোগ্য হবেন। এ অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ সাত ও সর্বনিম্ন দুই বছর কারাদণ্ড এবং ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষায় কর্মরত নাগরিক সংগঠন ‘সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন’-সংশ্লিষ্টদের মতে, এ আইনে অপরাধীর শাস্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা স্পষ্ট। তাদের দাবি, এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে শাস্তি বাস্তবায়ন উপযোগী করতে হবে। কারণ বাঘ না থাকলে সুন্দরবন থাকবে না, আর সুন্দরবন না থাকলে বাংলাদেশ ভয়াবহ পরিবেশ সংকটে পড়বে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, ‘এখনো সুন্দরবনের বাঘের প্রধান হুমকি তিনটি। এগুলো হলো বাঘ হত্যা, বাঘের শিকার হরিণ হত্যা এবং বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। বাংলাদেশে বাঘের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে গত কয়েক বছর সরকারি উদ্যোগে বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।’
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘আমাদের লোকবল অপ্রতুল। তারপরও তা দিয়ে যতটুকু সম্ভব আইন প্রয়োগ করার চেষ্টা করছি। বন্যপ্রাণী শিকারি ও বনদস্যুদের গ্রেফতারে বন বিভাগ, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘বাঘ হত্যা বন্ধে আমরা তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছি। বনের ভেতরে অপরাধী শনাক্ত করতে পারলে ৫০ হাজার, লোকালয়ে হলে ২৫ হাজার টাকা দেয়া হয়। তবে শুধু আইন দিয়ে কাজ হবে না, প্রয়োজন মানুষের সদিচ্ছা ও সচেতনতা।’
র্যাব, পুলিশ, বন বিভাগ ও বনজীবী সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের বাঘ হত্যায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। চোরা শিকারিরা সুন্দরবনে বিভিন্নভাবে বাঘ হত্যা করে। ‘গডফাদার মহাজন’-এর কাছ থেকে অগ্রিম ‘দাদন’ নিয়ে ছদ্মবেশে বনে ঢোকে একশ্রেণীর শিকারি। কখনো গুলি করে, আবার কখনো ফাঁদে আটকে বাঘ শিকার করে তারা। ছাগল বা হরিণ মেরে সেগুলোর শরীরে বিষ মেখে বাঘের খাবার হিসেবে বনে ফেলে রাখা হয়। বাঘ এসব বিষমাখা মৃত প্রাণী খেয়ে বিষের প্রতিক্রিয়ায় মারা যায়, আর তা নাহলে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। তখন সহজে হত্যা করা হয়।
মৃত বাঘের শরীর থেকে চোরা শিকারিরা চামড়া, মাংস, চর্বির তেল, মাথার খুলি, দাঁত, পুরুষাঙ্গ, হাড়সহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে। এরপর আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের কাছে এসব চড়া দামে বিক্রি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কালোবাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। এর ফলে সুন্দরবনের বনভূমি ডুবে যাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বাঘের বিচরণ ক্ষেত্র কমেছে। পাশাপাশি লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় মিষ্টি পানি না পাওয়ায় লবণাক্ত পানি পান করে বাঘ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বার্ধক্যজনিত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কিছু বাঘ মারা যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নির্বিচারে গাছ কেটে উজাড় করা, খাদ্যসংকট, অপরিকল্পিত পর্যটন ও বনের মধ্য দিয়ে ভারী নৌযান চলাচলেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের বাঘের ওপর। বাঘের বিচরণ ক্ষেত্রগুলোতে হরিণের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মাঝে মধ্যে বাঘের খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এ সময় বাঘ নদী-খাল পেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসে। গ্রামবাসী তখন পিটিয়ে বাঘ হত্যা করে।
অবশ্য সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেএম হাসানুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সালের পর থেকে কোনো বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করেনি। এখন আর পিটিয়ে বাঘ হত্যার খবর পাওয়া যায় না।’
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৩ মার্চ ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের দুটি অংশ ছিল। যার একটি ছিল বাঘ জরিপ ও অন্যটি বাঘ সংরক্ষণ। চলতি বছরের মার্চে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে মোট নয়বার সুন্দরবনের বাঘ জরিপ করা হয়েছে। তবে ২০১৫ সালের আগের জরিপগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের সর্বশেষ বাঘ জরিপে বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ হিসাবের বাইরেও ২১টি বাঘের শাবক পাওয়া গেছে। তবে কম বয়সী শাবকদের উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে তাদেরকে মূল তালিকায় রাখা হয়নি।
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী দাবি করেন, গত পাঁচ-সাত বছরে সুন্দরবনের প্রাণীর পরিমাণ বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে যাওয়া পর্যটকরাও বাঘের চলাচল কিংবা নদী পার হওয়ার চিত্র বেশি দেখতে পাচ্ছেন। পাশাপাশি বাঘ যেসব প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলোর সংখ্যাও বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাঘের প্রজনন, বংশ বৃদ্ধিসহ অবাধ চলাচলের জন্য সুন্দরবনের আয়তনের ২৩-৫২ ভাগ এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাঘ সাধারণত উঁচু স্থানে থাকতে পছন্দ করে। আর প্রজনন মৌসুমে তারা সবসময় উঁচু স্থান বেছে নেয়। সুন্দরবনে যেসব জায়গায় বাঘের আনাগোনা বেশি, সেসব জায়গায় টিলা নির্মাণ ও টিলার পাশে একটি করে মিঠাপানির পুকুর খনন করা হয়েছে। বন বিভাগ, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে বাঘ শিকার প্রতিরোধে কাজ করছে।’



