প্রধান খবরবাংলাদেশমুক্তিযুদ্ধ

কলাতিয়ার স্বপ্ন জাগানিয়ারা

মুবিন খান

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর আর সকলের মতো ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র-যুবকেরাও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁরা প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন। একাত্তরের মে মাসে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন ‘সশস্ত্র সংগ্রামে নিজ উদ্যোগে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের’ সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করেছিল। ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’ নামেই এই বাহিনী পরিচিত হয়ে উঠেছিল। এঁদের নেতৃত্বকে একটা মাত্র একক কমান্ডো ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। এই বাহিনী গঠনের বিষয়টি শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদই  জানতেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৭ হাজার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন প্রায় ১২ হাজার, বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে ছিলেন প্রায় পাঁচ হাজার। এই গেরিলারা  স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন।

অনেক পরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হবার পরও মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ এই গেরিলা বাহিনীকে কোনও স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ২ হাজার ৩৬৭ জন মুক্তিযোদ্ধা আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। আদালতের রায় এবং নির্দেশে ২০১৩ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ২৩৬৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতি দেয় তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরের বছর  ওই প্রজ্ঞাপনকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে তা বাতিল করে আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। অনেক জল ঘোলা করে অবশেষে আদালতের নির্দেশ মেনে নেয় মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

গেল ১৬ মার্চ ২০১৯ একাত্তরের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অল্প কজন এক পুনর্মিলনে একসঙ্গে হয়েছিলেন। পুনর্মিলনের আয়োজনটি মুক্তিযোদ্ধা মহানগরীর অনতি দূরে কলাতিয়ার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া তাঁর নিজ বাড়ির লাগোয়া আম বাগানে করেছিলেন। 

৪৭ বছর আগে একই রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে মানুষগুলো যুদ্ধ করেছেন, আজ তাঁরা বয়সের ভারে অনেকেই ন্যুব্জ।  স্ত্রী-সন্তান-পরিজন নিয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত জীবন অতিবাহিত করেও কোথায় যেন কেটে গেছে সুর। পরাজিত নন, বিজয়ী তাঁরা। কিন্তু তবুও হতাশা তাঁদের পিছু ছাড়েনা। সেই হতাশাটাই ফুটে উঠেছে মঞ্চে টানানো ব্যানারে। ব্যানারে লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা সমুন্নত রাখুন।”

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। যিনিই দেশ পরিচালনের দায়িত্বে থেকেছেন  তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে বলে ব্যক্তিবন্দনা আর নিজের উন্নতি করেছেন। চলে আসতে আসতে  এই ধারাটিই যেন প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। ফলে এখন মানুষ জানেই না মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল স্পিরিট কি এবং কোথায় !

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে সমগ্র দেশবাসী  বুঝত-

 ১. গণতন্ত্র 

২. সমাজতন্ত্র 

৩. ধর্মনিরপেক্ষতা এবং 

৪. জাতীয়তাবাদ।   

এই চারটি বিষয় মিলে গিয়ে যা তৈরি করে সেটি হলো- বৈষম্যের অবসান। পূর্ব পাকিস্তানে যারা বাস করতেন তাঁদেরকে সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হতো। তাদের প্রতি পক্ষপাতমূলক অন্যায় আচরণ, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা করা হতো। বাঙালিরা পাকিস্তানের অন্য নাগরিকদের তুলনায় নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করত। এই বৈষম্যর প্রতিবাদ করতেই, এই বৈষম্য ঘোচাতেই, এই বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।

কিন্তু এখন গণতন্ত্রের ধারণা পাল্টে গেছে। সমাজতন্ত্র বলতে লোকেরা এখন কোনও আদর্শ বোঝে না, বোঝে কজন মানুষের মুখ। ফলে সমাজতন্ত্র এখন দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে। আর রাষ্ট্র যেহেতু প্রাণ ধারণ না করেও ধার্মিক হয়ে গেছে, সে কারণে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ থাকবারও আর কোনও কারণ নাই। এবং যেভাবে দেশের মানুষ ‘বাঙালি’ শব্দটাকেই গালাগাল হিসেবে ব্যবহার করছে, যেভাবে সকল বয়সের মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছে, যেভাবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে ডেকে এনে দুধেভাতে রাখা হচ্ছে তাতে জাতীয়তা ব্যাপারটা যে কি সেটা নিয়েই প্রশ্ন খাড়া করা যেতে পারে। 

যে চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, স্বাধীনতার পর সেটা ‘রাজাদের প্রজাতন্ত্রে’ হারিয়ে গেল যেন। সে কারণেই আজ একাত্তরের বিশেষ গেরিলারা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বাস্তবায়নের কথা বলছেন। তবে সেই সঙ্গে তাঁরা তাঁদের ব্যর্থতার দায়টিও স্বীকার করে নিয়েছেন। এই ব্যর্থতা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি না করতে পারার ব্যর্থতা। কিন্তু স্বপ্নবাজ মানুষ এঁরা। স্বপ্নের জন্যে জীবনকেও তুচ্ছ করতে পারেন যারা, প্রাণটাকে মুঠোতে ধরে মরণের সঙ্গে যারা লড়াই করতে পারেন, তাঁরা এত সহজে দমে যাবেন কেন! 

ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে যে হতাশার পথ বেয়ে উদ্ভব তৈরি করেছিল, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে চাওয়া চোখগুলো সে হতাশাকে কাটিয়ে উঠে চকচক করে ওঠে। চকচকে চোখগুলো নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, সে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে প্রাণপণ পরিশ্রম করে চলেছে এই প্রজন্মের সন্তানেরা। গড়ে তুলছে বৈষম্যমুক্ত, অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত  অসাম্প্রদায়িক সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ। আর এদের দেশ গড়ার প্রধান নিয়ামক ‘মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension