প্রধান খবরবাংলাদেশশিক্ষা

আবু সাঈদ হত্যা: গুলি করতে পুলিশকে উস্কে দেন এক শিক্ষক

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার সময় সেখানে শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তারা গুলির আগমুহূর্তে ছাত্রদের মুখোমুখি অবস্থান করা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মিশে ছিলেন। হেলমেট পরা তাদেরই একজন এক পুলিশকে গুলি করতে বলেছেন, এমন দৃশ্যও দেখা গেছে। ঘটনার সময়কার বিভিন্ন স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন ছাত্র ও প্রতিবাদী শিক্ষকরা।

এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে নিহতের ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, এ বিষয়ে তদন্তকাজেও গড়িমসি করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঘটনার পর দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে গঠিত তথ্যানুসন্ধান কমিটি তাদের কাজ শুরু করেনি।

পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই বলেছেন, ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর ফটকের সামনে পুলিশ ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সময় প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সঠিক ভূমিকা পালন করলে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনা এড়ানো যেত। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদকে হত্যার পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দায়ী করে চলেছেন।

হত্যার ঘটনায় গত ১৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মতিউর রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তথ্যানুসন্ধান কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক শফিকুর রহমান এবং রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. বিজন মোহন চাকী। তারা তিনজনই উপাচার্যপন্থি। এ কারণে তাদের কাজ নিয়ে ছাত্র ও শিক্ষকরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন।

সমকালের অনুসন্ধানে জানা যায়, আন্দোলনের সময় হেলমেট পরে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন প্রক্টর অফিসের কর্মকর্তা রাফিউল হাসান, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল। পুলিশ যখন আবু সাঈদকে গুলি করে, সে সময় পুলিশের সঙ্গে একই দলে ছিলেন তারা। অন্য পাশে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা তখন স্লোগান দিচ্ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ছাত্র ও শিক্ষক দাবি করেন, এই শিক্ষক-কর্মকর্তারা পুলিশকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন গুলি ও গ্রেপ্তার করার। একাধিক ভিডিও চিত্রে তাদের এ ভূমিকা দেখা গেছে। তাদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকেও একই স্থানে থাকতে দেখা যায়।

এ ধরনের একটি ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের শান্ত করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা প্রক্টরদের। তবে ওই সময় প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরদের কেউই ঘটনাস্থলে ছিলেন না। আর যারা ছিলেন, তারা নিজেরাই হেলমেট পরে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে মিশে গিয়ে শিক্ষার্থী দমনে নেমেছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী বেশ কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে বাধা প্রদান শুরু করে ছাত্রলীগ। সংগঠনের বেরোবি সভাপতি পোমেল বড়ুয়ার নেতৃত্বে কোটা আন্দোলনকারীদের প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি ও নির্যাতন করে তারা। মারা যাওয়ার আগের দিনও আবু সাঈদ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় পোমেল বড়ুয়া তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে পোমেলকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ১৪ জুলাই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভকালে প্রথমে ছাত্রলীগ বাধা দেয়। তবে আন্দোলনকারীদের দমাতে না পেরে রংপুর মহানগর ও জেলা ছাত্রলীগ-যুবলীগের সহযোগিতা নেয় তারা। এ কারণে ১৫ জুলাই কোটা আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কর্মসূচি পালন করতে পারেননি। এ ঘটনার পর পোমেল বড়ুয়া তাঁর ফেসবুকে ‘সব ঝকঝকা, ফকফকা’ বলে স্ট্যাটাস দিলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ১৬ জুলাই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাদের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

সেদিন ছাত্রলীগ-যুবলীগ অস্ত্রশস্ত্রসহ পুলিশের সহায়তায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক এবং কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী হেলমেট পরে ছিলেন। ঘটনাস্থলে স্থিরচিত্র ও ভিডিওতে এ দৃশ্য ছিল স্পষ্ট।

ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে আবু সাঈদ পিছু না হটে পুলিশের সামনে বুক পেতে দিলে মাত্র ১৫ গজ দূর থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পুলিশ গুলি ছোড়ার আগমুহূর্তে প্রক্টর অফিসের কর্মকর্তা রাফিউল হাসান শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ‘গুলি করুন, গুলি করুন’ বলে জোরে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে অন্য দু’জন শিক্ষকও ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাবিউর রহমান বলেন, ‘আমরা আমাদের ভুলে সন্তানতুল্য একজন শিক্ষার্থীকে হারিয়েছি। কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার হেলমেট পরে পুলিশের সঙ্গে অবস্থানের বিষয়টি ভিডিও চিত্রে দেখেছি। এ ব্যাপারে সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাঁকে মেডিকেলে নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অ্যাম্বুলেন্স দিয়েও সহায়তা করেনি। সহপাঠীরা তাঁকে রিকশায় করে ১০ কিলোমিটার দূরে রংপুর মেডিকেলে নেওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এটা থেকে সহজেই অনুমেয় হয়, বেরোবি প্রশাসন চাচ্ছিল এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটুক।
বেরোবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সবকিছু দেখেছি। সাঈদের মৃত্যু একটি ঠান্ডা মাথার খুন। এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কারা উস্কানি দিয়েছে, কারা সহযোগিতা করেছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।’

অভিযুক্ত অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে ঘটনাস্থলে ছিলাম।’ ছাত্রদের পাশে না থেকে পুলিশের সঙ্গে কেন? মাথায় হেলমেট দিয়েই বা কেন মুখ লুকালেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামানের দাবি, ‘পুলিশকে বুঝিয়ে শুনিয়ে গুলি না করার অনুরোধ জানাতেই আমরা বিপরীতমুখী হয়েছিলাম।’

খবরও নেয়নি প্রশাসন
আবু সাঈদকে রংপুর মেডিকেলে নেওয়া হলে ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণার পরও কোনো খবর নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে মৃত্যু সংবাদ শোনার পর কয়েকজন শিক্ষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেডিকেলে গিয়েছিলেন। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আবু সাঈদের লাশ হাসপাতাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিতে চাইলে পুলিশের বাধায় তা সম্ভব হয়নি। পোস্ট মর্টেমের পর মধ্যরাতে পুলিশ পাহারায় পীরগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে লাশ নেওয়া হয়। সকালে প্রশাসনের উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেখানেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

সাঈদ নিহতের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা সমালোচনা উঠলে পরদিন উপাচার্যের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়।

এদিকে তিন সদস্যের তথ্যানুসন্ধান কমিটি এখনও কাজ শুরু করেনি। কমিটির সদস্য ড. শফিকুর রহমান এখনও রংপুরের বাইরে আছেন।

মামলায় উল্লেখ নেই মৃত্যুর কথা
উপাচার্যের বাসভবনের হামলার ঘটনায় গত ২৮ জুলাই কর্তৃপক্ষ একটি মামলা করে। রংপুর মেট্রোপলিটনের তাজহাট থানায় দায়ের করা এ মামলার আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা ৫০০-৬০০ জনকে। এতে ছাত্র নিহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ নেই। তবে উল্লেখ করা হয়েছে হামলা ও অগ্নিসংযোগে প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

দৈনিক সমকাল

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension