মুক্তিযুদ্ধ

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং একটি চিলেকোঠার কাহিনী

আলমগীর সাত্তার

 

মহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ আহামেদ রোডের একটি বাড়িতে থাকতেন তখনকার পিআইএ-র পাইলট ক্যাপ্টেন আলমগীর। বাসাটার পৈতৃকসূত্রে আংশিকভাবে মালিক ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম। আলমগীরের পৈতৃক বাসা ছিল পুরনো ঢাকা শহরের জিন্দাবাহার লেনে। আড়াই-তিন বিঘা জমির ওপর সে এক বিশাল বাড়ি। বাঙালিদের ঘরে ঘরে যে সমস্যা বিদ্যমান, সেই একই সমস্যার কারণে ক্যাপ্টেন আলমগীর একটি ছেলে ও একটি মেয়েসহ হালিমদের বাসায় ভাড়া থাকতেন। বাসাটা ছিল বেশ বড়। বাসার চিলেকোঠাও ছিল অনেক বড়। ওই চিলেকোঠায় একসঙ্গে আট-দশজন বসে আড্ডা দেওয়া যেত।

ক্যাপ্টেন আলমগীর ছিলেন ওই আড্ডার প্রধান চরিত্র। তার সঙ্গে আমার প্রথম কেমন করে পরিচয় হয় তার একটু বর্ণনা দিচ্ছি। করাচি থেকে পিআইএ-র ফ্লাইটে ঢাকা আসছিলাম। আড়াই-তিন ঘণ্টার ফ্লাইট। প্লেনের প্রথম শ্রেণিতে খুব বেশি যাত্রী ছিল না। প্রথম শ্রেণির একটি আসনে জানালার ধারে বসে আমি শ্যাম্পেন পান করছিলাম। আমি যে সারিতে বসেছিলাম, ওই সারির অন্য প্রান্তের একটি আসনে ক্যাপ্টেন আলমগীর বসে ছিলেন। এক সময় উঠে এসে তিনি আমার পাশের আসনে বসলেন। তারপর বলা নেই কওয়া নেই, তিনি একটি হাত আমার নাকের কাছে তুলে ধরে বললেন, গন্ধ পাও? আমি বুঝলাম না। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, মাছের গন্ধ! আমি মাছে-ভাতে বাঙালি। এবার বুঝতে পারলাম। বললাম, আমিও তাই। এরপর ঢাকায় অবতরণ করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত দু’জনে শ্যাম্পেন পান করেছি; পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা বলেছি। পিআইএ-র একটি মাইক্রোবাস আমাদের বাসায় পৌঁছানোর জন্য দেওয়া হয়েছিল। মাইক্রোবাস থেকে নেমে যাওয়ার আগে ক্যাপ্টেন আলমগীর তাঁর বাসার টেলিফোন নম্বর লিখে দিয়ে বললেন, বাসায় এসো। এরপরের কাহিনী হলো, মহাজ্ঞানী সাইরাস আড়াই হাজার বছর আগে বলে গিয়েছেন, একজন খাঁটি বন্ধু হলো আপন ভাইয়ের চেয়েও আপন। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কটা অমনই হলো।

আবার মহাম্মদপুরের বাসার চিলেকোঠার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক :

সময়টা ১৯৬৯-৭০ সাল। আমরা সাত-আটজন পাইলট ওই চিলেকোঠায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নিয়মিত আড্ডা দিতাম। আমরা সবাই ছিলাম বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা এই দলে ছিলাম ক্যাপ্টেন আলমগীর (প্রধানতম চরিত্র), ক্যা. রফিউল হক, ক্যা. শাহাবউদ্দিন, ক্যা. আকরাম আহমেদ, ক্যা. সরফুদ্দিন, ক্যা. মফিদুল ইসলাম, ক্যা. হালিম, ক্যা. আবদুল খালেক। খালেক সাহেবের পোস্টিং ছিল করাচিতে। কিন্তু ঢাকায় এলে তিনি চিলেকোঠার রাজনৈতিক আলোচনায় যোগদান করতেন। চিলেকোঠায় এসে আড্ডা না দিলেও আমাদের আর একজন বিশ্বস্ত সদস্য ছিলেন ক্যাপ্টেন আমিরুল ইসলাম।

১৯৬৯ সালেই আমরা উপলব্ধি করেছিলাম, পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের শোষণের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হলে আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে এবং তা করতে হলে দখলদার পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হলেই সেটা সম্ভব হবে। পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের ব্যাপারে কেমন করে প্রস্তুতি নিতে হবে এ বিষয়ে ক্যাপ্টেন আলমগীর, শাহাব, আকরাম, রফি, মফিদুল আমাদের এ কয়জন হার্ডকোর সদস্য ছাড়া আমরা আমাদের আলোচনায় অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে জানতে দিতাম না। আমরা জানতাম, পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের ব্যাপারে আমরা ভারত সরকারের সবরকমের সাহায্য এবং ভারতের মাটিতে আশ্রয় পাব।

আমরা আমাদের চিন্তা-ভাবনার কথা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে একান্তে তাকে বলেছি। বঙ্গবন্ধু শুধু বলেছেন, তোরা সঠিক চিন্তাই করেছিস। তিনি বলেছেন, শুধু তোদেরকেই না, সময়মতো আমি পুরো দেশবাসীকেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের আহ্বান জানাব।

আমরা রাজনীতিবিদ নই, তাই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতির ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের যে যোগাযোগ ছিল এ কথা ছাত্রনেতাদের মতো পরবর্তীকালে প্রচার করিনি। আমরা বক্তৃতা কম দিয়েছি, কিন্তু যুদ্ধ করেছি। ছাত্রনেতারা যুদ্ধ কম করেছে, বক্তৃতা দিয়েছে বেশি।

১৯৬৯ সালে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য বায়াফ্রা প্রদেশ যুদ্ধরত ছিল। কিন্তু তারা পার্শ্ববর্তী কোনো  দেশ থেকে তেমন একটা সাহায্য পায় নি বলে স্বাধীনতা অর্জনে ব্যর্থ হয়।

১৯৬৯ সালে স্বাধীনতাকামী বায়াফ্রার একটি বিমানবাহিনী ছিল। ওই বাহিনীর ছোট ছোট তিন-চারখানা এরোপ্লেন ছিল। পাইলটের সংখ্যা ছিল দশ-এগারোজন। এর মধ্যে ছয়জন ছিল ইউরোপীয় ভল্যান্টিয়ার পাইলট। এদের মধ্যে সুইডেনের অধিবাসী গুস্তাভ কাউন্টভন রজেন নামের  একজন পাইলট ছোট একখানা এরোপ্লেনের ডানার দু’পাশে রকেট সংযোজন করে একাকী রাতের বেলায় নাইজেরিয়ার একটি বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়ে নয়খানা নাইজেরীয় মিগ-১৭ ফাইটার প্লেন ধ্বংস করেছিলেন। তখনকার নিউইয়র্ক টাইমস এবং নিউজউইক পত্রিকায় কাউন্টভন রজেনের দুঃসাহসিক অভিযানসহ বায়াফ্রার বিমানবাহিনীর কথা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেছিল। বায়াফ্রার বিমানবাহিনীর নামও ছিল ‘বিএএফ’ অর্থাৎ বায়াফ্রান এয়ারফোর্স। যেমন আমাদের বিমানবাহিনীর নামও ‘বিএএফ’।

এখানে একটি কথা বলে নেওয়া যাক। চিলেকোঠার আড্ডায় আমরা শুধু দেশের রাজনৈতিক, পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য নিয়েই আলোচনা করতাম তা নয়, এরোপ্লেনের টেনিক্যাল বিষয় নিয়েও আলোচনা হতো। এরপর ছিল পানীয় পানের আসর। পানীয় সরবরাহে আমাদের কমতি ছিল না। বাসার নিচতলা থেকে মিসেস আলমগীর, আমাদের সবার ভাবী পর্যাপ্ত পরিমাণের চেয়ে বেশি খাবার-দাবার সরবরাহ করতেন। সুতরাং আড্ডাটা ছিল বেশ আনন্দময়।

বায়াফ্রার বিমানবাহিনীর কথায় ফিরে আসা যাক : কাউন্টভন রজেনের দুঃসাহসিক সফল অভিযান আমাদের খুব উদ্দীপ্ত করেছিল। আমরা আলোচনা করতাম, ছোট ছোট দু’একখানা এরোপ্লেন পেলে কাউন্টভন রজেনের মতো ওই প্লেনে রকেট সংযোজন করে আমরাও তেজগাঁও বিমানবন্দরে রক্ষিত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সব ফাইটার প্লেন এবং হেলিকপ্টারগুলো ধ্বংস করে দিতে পারতাম। আমরা তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে, আমরা অল্পদিন পরই মুক্তিযুদ্ধের সময় এমনই ছোট ছোট দু’খানা এরোপ্লেন এবং একখানা ডাকোটা প্লেন পাব এবং তাই দিয়ে মুক্তিবাহিনীর এয়ারফোর্স গঠন করব।

ওই মুক্তিবাহিনী এয়ারফোর্সের প্রধান ছিলেন এভিএম এ কে খন্দকার। তার নামের আদ্যক্ষর কে (শ) অনুযায়ী মুক্তিবাহিনীর এয়ারফোর্সের নামকরণ করা হলো ‘কিলো ফ্লাইট’। আর ওই ছোট ছোট প্লেন দিয়ে আমরা ৫০টারও বেশি সফল অভিযান পরিচালনা করে পাকবাহিনীর অসামান্য ক্ষতিসাধন করেছিলাম।

কিলো ফ্লাইট গঠিত হয়েছিল দশজন পাইলট দিয়ে। সবাই বীরত্বসূচক খেতাব পেয়েছিলাম। এর মধ্যে সাতজন বীরোত্তম এবং তিনজন বীরপ্রতীক। কিলো ফ্লাইটের দশজন পাইলটের মধ্যে পাঁচজনই  ছিলাম চিলেকোঠার সদস্য। এরা হলো : ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন (বীরোত্তম), ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ (বীরোত্তম), ক্যাপ্টেন সরফুদ্দিন (বীরোত্তম), ক্যাপ্টেন আবদুল খালেক (বীরপ্রতীক), ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার (বীরপ্রতীক; লেখক)। চিলেকোঠার দু’জন সদস্যকে পাকবাহিনী হত্যা করেছিল। এঁরা হলেন ক্যাপ্টেন আলমগীর এবং ক্যাপ্টেন আমিরুল ইসলাম।

ক্যাপ্টেন আলমগীর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতে যাওয়ার পথে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ওখানে যাওয়ার পর তিনি প্রচন্ডভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই তাকে ঢাকায় ফিরে আসতে হয়। ঢাকায় ফিরে আসার পর তিনি পাকবাহিনীর হাতে ধৃত হন এবং ওই বর্বর বাহিনী তাকে হত্যা করে। ক্যাপ্টেন আমিরুল ইসলাম কোথাও যান নি। তিনি তাঁর কলাবাগানের বাসায় ছিলেন। সে বাসা থেকে পাকবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে।

মুক্তিবাহিনী এয়ারফোর্স গঠিত হয়েছিল এভিএম এ কে খন্দকারের প্রস্তাব অনুযায়ী এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল পিসি লালের সুপারিশক্রমে। মুক্তিবাহিনী এয়ারফোর্সের জন্য খন্দকার সাহেব কেমন ধরনের এরোপ্লেনের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন, তা আমার জানা নেই। তবে ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন এবং আমি প্রায় দেড় মাস দিল্লিতে ছিলাম। তখন বায়াফ্রার বিমানবাহিনীর পাইলট কাউন্টভন রজেনের দুঃসাহসিক কথা মনে রেখে আমরা ভারতীয় বিমানবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসারদের ছোট আকৃতির প্লেনের জন্য প্রস্তাব রেখেছিলাম। যখন আমাদের কিলো ফ্লাইট গঠিত হয়, তখন আমরা যেমন যেমন এরোপ্লেন চেয়েছিলাম, তেমন তেমন এরোপ্লেনই লাভ করেছিলাম। এমনকি আমাদের মুক্তিবাহিনী এয়ারফোর্সের যে একখানা ডাকোটা প্লেন ছিল, তাই দিয়ে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরের ওপর বোমাবর্ষণের সর্বপ্রকারের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধকৌশলের পরিবর্তনের কারণে ঢাকার অভিযান পরিত্যক্ত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে একটি চিলেকোঠার কয়েকজন সদস্যের যে অবদান, তা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension