আন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধ : যুক্তরাষ্ট্রের ভুলে ভরা গল্প

ইরান যুদ্ধ নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পারিষদরা গত কয়েক মাসে এমন অনেক কথা বলেছেন, যা পরে তাদের গিলতে হয়েছে।

তারা চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন সব ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছেন, পরে যার কিছুই মেলেনি। বরং তাদের আত্মবিশ্বাস চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। নিজেদের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই, এমন উদাহরণও কম নয়। অনেক সময় নিজেদের কথাই তাদের হাস্যকর ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্প নিজে যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, সেখানে আসলে কী ঘটছে সে সম্পর্কে তাঁর নিজেরই কোনো ধারণা বা বোঝাপড়া নেই। মার্কিন বাতা সংস্থা সিএনএন এক বিশ্লেষণে গত সাড়ে চার মাসে মার্কিন হম্বিতম্বির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক তুলে ধরেছে।
গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র শিগ্‌গিরই হরমুজ প্রণালির অভিভাবক হিসেবে এর নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী দেশগুলোর জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ হারে ফি ধার্য করবে।’ অথচ গত মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, ‘আমরা সবসময়ই বলে এসেছি যে এই প্রণালিতে কোনো টোল ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হবে না।

আর এটা শুধু আমরাই বলছি না, পুরো বিশ্বই বলছে। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ হবে।’ বৈধতার প্রশ্ন পরে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা বাস্তবসম্মতও নয়। কারণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে, যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। ধারণাটি যে বাস্তব নয়, তা প্রমাণ করেছেন ট্রাম্প নিজেই।
একদিনের মধ্যেই ট্রাম্প নিজের ঘোষণা থেকে সরে আসেন।
শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটা সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল যুদ্ধ ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ স্থায়ী হবে। দুইমাস পর ১ মে তিনি বলেছিলেন, এ যুদ্ধ খুব দীর্ঘ হওয়া উচিত নয়। বাস্তবতা হলো সাড়ে ৪ মাস পরও যুদ্ধ শেষের কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।

গত মাসে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা ইরানের নেতাদের সম্পর্কে ভালো ভালো অনেক কথা বলেছিলেন। যেন হঠাৎ করেই তারা ভালো হয়ে গেছেন। ১৬ জুন ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা এমন লোকদের সঙ্গে আলোচনা করছি যাদেরকে আমার খুব যৌক্তিক মানুষ মনে হয়। তারা আলোচনার জন্য বেশ ভালো এবং উগ্রপন্থি নন।’ ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাডি ভ্যান্সও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইরানের নেতাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তবে তাদের এ কথা গিলে নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি। গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি এবং সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প এখন ইরানের নেতাদের ‘পাগল’, ‘দুষ্ট’, ‘অসুস্থ’, ‘নোংরা খেলোয়াড়’, ‘নিকৃষ্ট’ বলে অভিহিত করছেন। এখন মানুষ কোনটাকে সত্য বলে মেনে নেবে। ইরানি নেতারা কি আসলে যৌক্তিক না কি পাগল?

যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, তারা হামলা চালানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরানের জনগণ মাঠে নেমে এসে শাসনব্যবস্থা বদলে দেবে। যুদ্ধের শুরুর ঘোষণায় ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘আমি সেই সমস্ত ইরানি দেশপ্রেমিকদের আহ্বান জানাচ্ছি যারা স্বাধীনতার জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন, তারা যেন এই মুহূর্তটিকে আঁকড়ে ধরেন। সাহসী হন, নির্ভীক হন, বীরত্ব দেখান এবং আপনাদের দেশ ফিরিয়ে নিন। আমেরিকা আপনাদের পাশে আছে। আমি আপনাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা পূরণ করেছি। বাকিটা আপনাদের ওপর নির্ভর করছে, তবে আমরা সেখানে সাহায্য করার জন্য থাকব।’ কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। বরং মার্কিন হামলা ইরানের শাসক ও জনগণকে আরো ঐক্যবদ্ধ করেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন হামলার প্রথম দিনেই নিহত ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ যাত্রায় উল্টো আমেরিকার বিরুদ্ধে গণজাগরণ হয়েছে। শুরুতে ট্রাম্প যে গণজাগরণের ডাক দিয়েছিলেন, এখন তিনি নিজেই সেটা ভুলে যেতে চান। এখন ট্রাম্প উল্টো বলছেন, ‘তাদের (ইরানি জনগণ) সম্পূর্ণ সশস্ত্র না করা পর্যন্ত আমি কখনই ভাবিনি যে তারা এই ধরনের অভ্যুত্থান ঘটাতে পারবে, কারণ তাদের তথাকথিত নেতৃত্ব অত্যন্ত সহিংস।’

ইরান যখন হরমুজ প্রণালিকে যুদ্ধের মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করলো, তখন শুরুতে মার্কিন প্রশাসন পাত্তাই দেয়নি। তারা এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যে এটি কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ১৩ মার্চ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ‘এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।’ এর আগে, ৯ মার্চ ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এই প্রণালিটি আমাদের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না, কারণ আমাদের প্রচুর তেল রয়েছে।’ ট্রাম্প আরো বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি নিরাপদই থাকবে। কিন্তু তার কোনো ধারণাই সত্য হয়নি। হরমুজ প্রণালিটি নিরাপদ থাকেনি। বাস্তবতা হলো ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলেছে, যার প্রভাব পড়েছে মাকিন অর্থনীতিতেও।

যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রশাসন দাবি করেছিল জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে এবং হরমুজ প্রণালির বন্ধ থাকা তাতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। গত ৮ মার্চ মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছিলেন, ‘খুব বেশি সময় লাগার আগেই জ্বালানি তেলের দাম আবার প্রতি গ্যালন ৩ ডলারের নিচে নেমে আসবে।’ ঠিক কখন কমবে, এমন প্রশ্নের জবাবে রাইট বলেছিলেন, পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হলেও কয়েক মাসের পরিবর্তে মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। বাস্তবে পরিস্থিতি রাইটের বলা সবচেয়ে খারাপ ধারণার চেয়েও মারাত্মক রূপ নিয়েছে। চার মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও গ্যাসের দাম এখনো ৩ ডলারের নিচে নামেনি। জ্বালানি তেলের জাতীয় গড় মূল্য এখনো ৩.৭০ ডলারের ওপরে। বরং নতুন করে সংঘাত শুরুর পর দাম জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়ছে। এতে বোঝা যায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং তেলের দামের ওপর হরমুজ প্রণালির প্রভাব সম্পর্কে মাকিন প্রশাসনের পরিষ্কার কোনো ধারণাই নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক মাসে বারবার দাবি করছিলেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির করার জর‌্য বেপরোয়া, মরিয়া; তারা নাকি চুক্তির জন্য মিনতি করছিলেন। ট্রাম্প বারবারই বলতেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি হাতের নাগালে। কিন্তু গত তিনমাসর ঘটনাপ্রবাহ যারা দেখেছেন, তারা জানেন ট্রাম্পের এই দাবি কতটা অসার। বরং যুক্তরাষ্ট্রকেই চুক্তির জন্য মরিয়া মনে হয়েছে। তারচেয়ে বড় কথা হলো গত মাসে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তা ইরানের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক ও লাভজনক ছিল।

যুদ্ধের শুরুর দিনগুলো থেকেই ট্রাম্প এবং হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরানের পরাজয় সুনিশ্চিত, তাই তারা কোনো ঝুঁকি ছাড়াই যেখানে খুশি সেখানে উড়ে যেতে পারবেন। ৪ মার্চের এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ দাবি করেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের আকাশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে। এবং ইরান এ বিষয়ে কিছুই করতে পারবে না’। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পও বলেন, ‘ইরান এ বিষয়ে কিছুই করতে পারবে না। কারণ তাদের কোনো বিমান বিধ্বংসী সরঞ্জাম নেই। তাদের রাডার ব্যবস্থা শতভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। সামরিক শক্তি হিসেবে আমরা অপরাজেয়।’ কিন্তু এপ্রিলের শুরুর দিকেই ইরান দুটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করে ট্রাম্প আর হেগসেথের বাগাড়ম্বর চোখে আঙুল দিয়ে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ আসলে আমেরিকার জন্য এক ভুলে ভরা গল্প।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension