
সম্পাদকীয়
কালজয়ী সুরস্রষ্টাকে শ্রদ্ধা
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের পরিচয় যতটা বহুবিধ, ততটাই তাঁর খ্যাতির সীমানাও অনেক বিস্তৃত। তার চিন্তা-চেতনায় ও কর্মে মিশে ছিল দেশপ্রেম। এজন্যই তিনি মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার টানে কিশোর বয়সেই চলে যান রণাঙ্গনে। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ পর্বের প্রায় শেষ সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে তিনি আটক হন। নির্মম নির্যাতনের পর তাঁকে পাঠানো হয় কারাগারে। ওই সময় সেই কারাগার থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে বের করে এনে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করলেও তিনি বেঁচে যান সৌভাগ্যক্রমে। টর্চার সেলে অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করেছেন। দেশ স্বাধীন হলে রমনা থানা থেকে যে ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন কালজয়ী এই সুরস্রষ্টা।
এর কিছুদিন পর খুন হন তার ছোট ভাই। ওই মর্মন্তুদ ঘটনার পর পুলিশ প্রহরায় তার জীবন কেটেছে। সুরকার, গীতিকবির পরিচয় ছাপিয়ে তার বড় পরিচয় একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। তিনি আধুনিক, সিনেমার গান রচনা ও সুরারোপ করলেও বেশিরভাগ দেশাত্মবোধক গানই তার লেখা ও সুরারোপিত। এক্ষেত্রে তিনি অনন্য।
স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা গানের জগতে মুক্তিযুদ্ধকে তিনি শুধু আঁকড়ে ধরেই থাকেন নি, নতুন দ্যোতনারও সৃষ্টি করেছিলেন দেশাত্মবোধক গানে। তার লেখা ও সুরারোপিত বহু কালজয়ী গান দেশের বরেণ্য শিল্পীরা গেয়েছেন। তার আঙুল গিটারের তার স্পর্শ করেছিল কৈশোরেই। গান রচনাও তখনই শুরু। তবে সুরারোপ আরও কিছুটা পরে হলেও তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। তার সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে তাকে স্থান করে দিয়েছে। দিয়েছে অমরত্ব।
শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের অর্জনের ঝুলিতে আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা রয়েছে। অসংখ্য সঙ্গীতপ্রেমী ও শ্রোতার হৃদয়ছোঁয়া ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা লাভ করেছেন তিনি। দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তার সৃষ্টির ভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ। ২২ জানুয়ারি তার ৬৩ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটলেও এমন কীর্তিমানের স্মৃতি কখনও মানসপট থেকে মুছে যাবে না। গভীর শ্রদ্ধা তাঁর স্মৃতির প্রতি।
