Uncategorized

‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’

সাজিয়া আফরিন

আমদের সমাজে বউ হিসেবে সবসময় সুন্দর মেয়ে খোঁজা হয়। আর সুন্দর মানেই আমরা ধরে নেই ফর্সা। অর্থাৎ সুন্দরের প্রথম শর্তই ফর্সা। চোখ ছোট, নাক ভোঁতা ,দাঁত বাঁকা যাই হোক না কেন, সবই চলবে মেয়ে যদি হয় সাদা।

সে কারণে গর্ভের সন্তান মেয়ে জানার পর বাবা মা আরও বেশি চিন্তায় পড়ে যান এটা ভেবে যে, রঙ কেমন হবে? বাড়িতে সুন্দর সুন্দর ছবি লাগানো হয়, গর্ভবতী মাকে বলা হয় সুন্দর কিছু দেখতে যেন সন্তানের বাহ্যিক রূপের ওপর সেগুলোর প্রভাব পড়ে। কি কি খাদ্য গ্রহণ করলে সন্তানের গায়ের রং সাদা হতে পারে সেসব নিয়ে চলে ব্যস্ততা।

তবে এর প্রস্তুতি কিন্তু আরও আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। বিয়ের জন্য ছেলে, ছেলের পরিবার খোঁজে ফর্সা মেয়ে, তাহলে সে ভবিষ্যতে যে সন্তান জন্ম দেবে তারাও ফর্সা হবে। হোক না সেই বিবাহযোগ্য ছেলের রঙ রাতের মত অন্ধকার।

তাহলে কি ধরে নেব একটা সন্তানের রূপ রঙ শুধু মায়ের গায়ের রঙয়ের ওপর নির্ভর করে?

এমনও চোখে পড়ে মায়ের রঙ ফর্সা কিন্তু তার সন্তান শ্যমলা, কারণ বাবা শ্যমলা তাই। তাহলে আমরা কেন সন্তানের গায়ের রঙয়ের জন্য মায়ের ওপর নির্ভর করি আর স্ত্রী নির্বাচনে সাদা-কালো রঙ বিচার-বিশ্লেষনে নেমে যাই?

ভৌগোলিক দিক বিচারে আমাদের আবহাওয়া যেমন তাতে বাদামী, শ্যামলা রঙয়ের আধিক্য বেশি।

তাই রঙ বিচারে আমরা শ্যামবর্ণ বা উজ্জল শ্যামবর্ণ, বাদামী আবার কখনও ফর্সা। তবে ফর্সার চেয়ে শ্যামবর্ণ বা উজ্জল শ্যামবর্ণই বেশি। সংমিশ্রণের কারণে আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও আলাদা আলাদা। তবে এক জায়গায় মনে হয় সবার চরিত্রে বড়ই মিল আর সেটা হল, গায়ের রঙ বিচারে। আমরা সবাই ফর্সাটাকেই প্রাধান্য দেই।

পুত্র সন্তান শ্যামলা হলে আমরা বলি কালো হোক আর ফর্সা ছেলে তো ছেলেই; আর কন্যা সন্তান শ্যামলা  হলে বাবা মা কি করে গায়ের রঙ ফর্সা করবে এ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। চিন্তিত হয়ে পড়েন কি করে মেয়েকে ভালো পাত্রস্থ করবেন।  কেননা আমাদের সমাজে শ্যামবর্ণ মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, চেহারা, আচার ব্যবহার যত ভালোই হোক না কেন তাকে শুনতে হবেই- ‘মেয়ে তো শ্যামলা!’

আমাদের সমাজে বেশীর ভাগ পুরুষই তার শয্যাসঙ্গী হিসেবে কালো মেয়ে চায় না, চায় না কালো মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে। তারা চায় এমন কাউকে যাকে রাতের আঁধারেও আলোর মত দেখাবে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশাল পরিমাণ যৌতুকের বিনিময়ে মেয়েকে বিয়ে দিতে হয়। কালো মেয়েকে বিয়ে করা যায় না, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায় না, কিন্তু বড় ধরনের উপহারের আড়ালে যৌতুকের বিনিময়ে কালো মেয়েটি হঠাৎই রূপসী হয়ে ওঠে, তাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে আর স্বপ্ন দেখতে মন চায়। এই তো আমাদের সমাজের চিত্র! তবে এরকম মেকি সম্পর্ক যেটা যৌতুকের বিনিময়ে কেনা, সেটা কি টিকে থাকে? নাকি সেখানে কোন সুখ বলে কিছু থাকে?

ফলে এমন অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সংসারে কালো মেয়েরা কখনই ভালো থাকে না। তারা সারাজীবন হীনমন্যতায় ভোগে। আর এর জন্য দায়ি পুরো সমাজ ব্যবস্থা, সমাজের মানুষের মানসিকতা আর রুচিবোধ। আমরা সৌন্দর্য ব্যপারটাই বুঝি না। শ্যামগাত্রের কন্যাও যে রূপসী হতে পারে সেটা ভাবতেই পারি না। এখানে শুধু মেয়েদের মূল্যায়ন করা হয় সাদা-কালো রঙের বিচারে। অথচ এটাতে মানুষের নিজের কোন হাত নেই।

আমরা এখনও সৌন্দর্যের অর্থ বুঝে উঠতে পারি নি। এটা আমাদেরই ব্যর্থতা। আমাদের সাদা-কালো গাত্রবর্ণ বিভেদ ঝেড়ে ফেলতে হবে, নারীকে তার রূপে নয়- তার কর্ম, শিক্ষা দিয়ে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। লেখকেরা তাদের লেখার মাধ্যমে এই বিষয়ে সবার দৃষ্টি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন। যেটা বহু বছর আগে রবীন্দ্রনাথ, আর নজরুল চেষ্টা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-

“কালো? তা সে যতই কালো হোক,   দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।…

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,   আর যা বলে বলুক অন্য লোক।”

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension