যুক্তরাষ্ট্র

ক্যালিফোর্নিয়ায় কেন হিন্দুদের বর্ণপ্রথা বিরোধী আইন করতে হচ্ছে?

হিন্দুদের বর্ণপ্রথা বিরোধী একটি আইন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য সরকার। চলতি সপ্তাহেই এ সংক্রান্ত একটি বিল পার্লামেন্টে উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। এটি আইনে পরিণত হলে তথাকথিত বর্ণের ভিত্তিতে কারও প্রতি আর বৈষম্য করা যাবে না। এই অঙ্গরাজ্যে ছোঁয়াছুয়ির বিষয়ে আর কোনো ভাবেই ধর্মের দোহাই খাটবে না।

বর্ণপ্রথা ভারতের অতিপ্রাচীন একটি সামাজিক সমস্যা। ভারতে এখনো এটি রয়েছে। বিশেষ করে দলিতরা এখনো নানাভাবে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হন। কিন্তু আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যে কেন এই বর্ণপ্রথা বিরোধী আইন করতে হচ্ছে? এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে বিবিসি। ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক স্বাধীন সাংবাদিক সবিতা পাতিল এই বিলের পক্ষে–বিপক্ষে মতামত তুলে ধরেছেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাসপাতালে নার্সের কাজ করেন সুখজিন্দর কাউর। হাসপাতালে দীর্ঘ ক্লান্তিকর কাজ করেন। কিন্তু বিরতিতে গেলেই বুঝতে পারেন তিনি এক নিপীড়নমূলক সমাজে বাস করেন।

সুখজিন্দর দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। ভারতের গভীর বৈষম্যমূলক বর্ণপ্রথায় এই দলিতরা সবচেয়ে নিচের স্তরের। সুখজিন্দর প্রায়ই উচ্চ বর্ণের হিন্দু সহকর্মীদের কাছ থেকে বর্ণবাদমূলক অসম্মানের সম্মুখীন হন।

দলিত অধিকার কর্মীরা বলছেন, বর্ণপ্রথার দোহাই দিয়ে নিপীড়নের শিকার ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দারা আবাসন, শিক্ষাগত, পেশাগত এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মুখীন হচ্ছেন।

গত মার্চে ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা সিনেটর আয়েশা ওয়াহাব এসবি–৪০২ বিলটি প্রণয়ন করেন। বৈষম্য বিরোধী এই বিলে লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম এবং অক্ষমতার পাশাপাশি বর্ণকেও একটি বিভাগ হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিলটি মে মাসে রাজ্যের সিনেটে ৩৪–১ ভোটে পাস হয়। এটি রাজ্যের পার্লামেন্টে পাস হলে ক্যালিফোর্নিয়া হবে বর্ণপ্রথা বৈষম্য নিষিদ্ধ করা প্রথম মার্কিন অঙ্গরাজ্য।

ক্যালিফোর্নিয়ায় যারা বিলটির পক্ষে তাঁদের মধ্যে একজন সুখজিন্দর। তিনি বলেন, ‘উচ্চ বর্ণের নার্সরা চামারদের (দলিতদের জন্য একটি নিন্দনীয় শব্দ) নোংরা ভাষায় গালি দেয়।’

গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম শহর হিসেবে সিয়াটল কর্তৃপক্ষ বর্ণপ্রথা নিষিদ্ধ করে। এরপরই ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইন প্রণেতারা উদ্যোগী হন। ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক ইকুয়ালিটি ল্যাবস নামে একটি সংগঠনের নেতৃত্বে ৪০ টিরও বেশি আমেরিকান এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনের জোট এটির প্রচারে কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের সংখ্যা বিপুল। বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি রয়েছে এখানে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৫ লাখের বেশি শিখ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি বাস করে ক্যালিফোর্নিয়ায়।

সম্প্রদায়ের দুটি বৃহত্তম অ্যাডভোকেসি গ্রুপ—শিখ কোয়ালিশন এবং শিখ আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স অ্যান্ড এডুকেশন ফান্ড—বিলটি সমর্থন করছে। শিখদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দলিত সম্প্রদায় রবিদাসিয়া—যাদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ হাজার—তাদের একেবারে তৃণমূল পর্যায়েও এই বিলের পক্ষে সমর্থন রয়েছে।

ইকুয়ালিটি ল্যাবসের সমীক্ষা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশীয় আমেরিকান প্রবাসীদের মধ্যে বর্ণপ্রথার কারণে নিপীড়িত চারজনের মধ্যে একজনই শারীরিক এবং মৌখিক আক্রমণের শিকার হন; তিনজনের মধ্যে একজন শিক্ষায় বৈষম্যের সম্মুখীন হন এবং তিনজনের মধ্যে দুজন কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের সম্মুখীন হন।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণপ্রথা এবং এর প্রভাব সম্পর্কে প্রথম বিস্তৃত একটি গবেষণা ছিল এটি। এতে অংশ নেন দেড় হাজার মানুষ। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘নিম্ন বর্ণের’ মানুষেরা প্রতি–আক্রমণের শিকার হওয়ার ভয় পান এবং তাঁরা ‘সমাজচ্যুত’ হওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তাই ‘জাত লুকিয়ে রাখেন’।

তবে ভারতীয় প্রবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্ণপ্রথার কারণে বৈষম্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।

সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক দলিত কর্মী দীপক অলড্রিন বিলটির পক্ষে নন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে ৩৫ বছর ধরে বসবাস করছি। কোনো হিন্দু আমাকে কখনো জিজ্ঞেস করেনি আমি কোন বর্ণের।’

বিলটি অনেক ভারতীয়-আমেরিকান ব্যক্তি, ধর্মীয় এবং পেশাজীবী গোষ্ঠীর তীব্র বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছে। তাঁরা যুক্তি দিচ্ছেন, বিলে ধর্মের নাম উল্লেখ করা না হলেও এটি ‘হিন্দুদের বিরুদ্ধে ও তাঁদের উপাসনালয়ের প্রতি বৈষম্য উসকে দেবে। এমনকি হিন্দুদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠতে পারে।’

ক্যালিফোর্নিয়ায় বিদ্যমান আইনগুলো যে কোনো বৈষম্য মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন তাঁরা। এটি আইনে পরিণত হওয়া ঠেকাতে তাঁরা সংগঠিত হচ্ছেন।

হিন্দুপ্যাক্টের অধীনে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং হিন্দু মন্দির রয়েছে। এই সংগঠন আমেরিকায় বসবাসরত হিন্দুদের পক্ষে কথা বলে। তারা ক্যালিফোর্নিয়ার আইন প্রণেতাদের প্রতি বিলটি প্রত্যাখ্যান করার জন্য আবেদন করেছে। এর আহ্বায়ক অজয় শাহ বলেছেন, বিলটি ‘গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ, অসৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের তরুণ ও যুবকদের এবং যারা হিন্দু ধর্ম অনুসরণ করে তাদের লক্ষ্য করে আনা হয়েছে।’

হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী পরিচালক সুহাগ শুক্লা বলছেন, এই বিল এরই মধ্যে বর্ণ সম্পর্কে একটি ‘অবাঞ্ছিত’ সচেতনতা তৈরি করছে। এটি একপর্যায়ে বর্ণগত হয়রানির কারণ হয়ে উঠতে পারে বলেও তাঁর আশঙ্কা। এরই মধ্যে এই ফাউন্ডেশন বিলে উল্লেখিত ‘বর্ণের সংজ্ঞাকে অসাংবিধানিক’ দাবি করে আদালতে মামলাও করেছে।

তবে বিলের লেখক আয়েশা ওয়াহাব ব্যাখ্যা করেছেন, ‘বিলে অন্যান্য সুরক্ষিত বিভাগের মতো বর্ণ শনাক্তকরণের বিস্তারিত বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কীভাবে বর্ণ নির্ধারণ করা হবে তার কোনো কথা এখানে নেই। এটি কেবল একটি বৈষম্য–বিরোধী বিল। যখন কেউ আদালতে একটি বিষয় নিয়ে যায়, তখন সাধারণত সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা নিযুক্ত হন, সম্ভাব্য বৈষম্যের ধরনটি জানতে তদন্ত করা হয়।’

আয়েশা ওয়াহাব বলেন, বিলটি প্রস্তাব করার পর তিনি ‘হত্যা হুমকি’ পেয়েছেন। এখন প্রত্যাহারের প্রচারণা ব্যাপকভাবে চলছে। এটি আবার ভোটে যেতে পারে। বিলটির বিরুদ্ধে যে প্রতিক্রিয়া সেটি হতাশাজনক। ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দাদের তিনি বিলটি পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আয়েশা বলেন, ‘আপনি উচ্চ বর্ণের বা নিম্ন বর্ণের যেই হোন না কেন, এতে কিছু যায় আসে না, এটি সবাইকে সুরক্ষা দেবে।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension