
জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
জাকির হোসেন, রূপসী বাংলা ডেস্কঃ গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতেই তাদের এই ঐক্য প্রক্রিয়া। দেশে ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। তাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতেই বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে।’
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চে ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’ আয়োজিত ‘নাগরিক সমাবেশে’ সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বেলা ৩টার দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির কয়েকজন নেতা রাজধানীর গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চে যান। বেলা সোয়া ৩টা থেকে ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে সমাবেশের মূল কাজ শুরু হয়। এর আগেই গণফোরামের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে।
বিএনপির মহাসচিবের সঙ্গে সমাবেশে যোগ দেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ ও আবদুল মঈন খান। বিএনপির নেতারা সমাবেশে যোগ দেওয়ার পর কর্মীরা ‘জাতীয় ঐক্য জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে থাকলে মির্জা ফখরুলসহ অন্যরা হাত ইশারায় তাদের থামতে বলেন। এ ছাড়া ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফতে মজলিসের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ভূমিকা পালন করা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শুরুর আগেই মহানগর নাট্যমঞ্চে উপস্থিত হন যুক্তফ্রন্টের শরিক জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। এ ছাড়া গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম নুরুল আমিন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর প্রমুখ।
সমাবেশে গণফোরাম সভাপতি বলেন, দেশের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। জানমালের নিরাপত্তা নেই। মানুষ আজ দিশেহারা। মানুষ সুশাসন ও আইনের শাসন চায়। তিনি বলেন, দেশের মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। আজ তা পুনরুদ্ধারে আমরা সমবেত হয়েছি। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণ বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। আজ জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিও হচ্ছে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা; রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রধান অতিথির ভাষনে যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, যারা পবিত্র স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, যারা পবিত্র পতাকার বিরুদ্ধে ছিল, যাদের হাত লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তে ভেজা, যারা এই মাটির বিরুদ্ধে ছিল এবং এখনও যারা স্বাধীনতার বিপক্ষে আছে তাদের সাথে আমরা ঐক্য করব না। শুধুমাত্র স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তিকে সাথে নিয়ে ভারসাম্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য বেগবান হতে পারে। আমরা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি এবং বিএনপির সাথে আলোচনা করছি। আশা করি ফলপ্রসূ হব। আমরা সবাই ইতিবাচক স্বপ্নে জেগে উঠতে চাই। স্বপ্নভঙ্গের অধ্যায় রচনা করার জন্য নয়।
তিনি বলেন, এখন রুখে দাঁড়ানোর সময়, এখন অধিকার আদায়ের সময়। প্রতিবাদের কণ্ঠ ধারালো করতে হবে। গণতন্ত্রের সপক্ষ শক্তির সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তির সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একটি স্বেচ্ছাচারী, গণতন্ত্রবিরোধী সরকার গত ১০ বছরে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, এমনি আবারও একটি অনুরূপ সরকারের ঝুঁকি আমরা নিতে পারি কি? সংসদে, মন্ত্রিসভায়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতেই হবে। না হলে স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করা যাবে না।
প্রধান বক্তা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত (বিএনপি প্রধান) খালেদা জিয়া কারাগার থেকে খবর পাঠিয়েছেন, যে কোন মূল্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, গত ১৮ দিনে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে ৩ হাজার ৭৭৬টি মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলার আসামি করা হয়েছে ৬৯ হাজার ব্যক্তিকে। প্রতিদিন রাতে বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এই সরকারকে সরিয়ে দিতে না পারলে দেশের স্বাধীনতা থাকবে না।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই ঐক্যের প্রধান দাবি সরকারের পতন, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন গঠন করতে হবে। ইভিএম দিয়ে নির্বাচন করা যাবে না।
সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবি করেছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু করার পূর্ব শর্ত- রাজবন্দিদের মুক্তি না দিলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। যে সরকার গঠন হবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে।
নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি কামনা করে মান্না বলেন, সেনাবাহিনীই পারে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না বলেও মত দেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারকে চোর, লুটেরা ও ডাকাত অভিহিত করে তিনি বলেন, এই সরকারের সময় ব্যাংকগুলোতে সোনা তামা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেই, মামলা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা লুটপাটের জন্য। আওয়ামী লীগ চোর, লুটেরা, ডাকাত। ওরা ব্যাংকের টাকা চুরি করে। এই চোরের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্ষমতা থেকে হঠাতে হবে। কারও ক্ষমতা নেই, এই ঐক্য রুখতে পারে। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগে বাধ্য করব।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ চেয়ে নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এই সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আমরা ভোট দিতে পারব না। ভোট দিতে পারলেও সঠিকভাবে ভোট গণনা হবে না।
এই সং মার্কা সংসদ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করলে চলবে না। এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করা চলবে না। নির্বাচনের আগে জনগণকে নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সারাদেশে আমরা যাব ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে। লাখো-কোটি মানুষকে নিয়ে এক দফার দাবি নিয়ে মাঠে নামা হবে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বৃহত্তর ঐক্য গঠনে জড়িত অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর সব দাবি মেনে নিতে সম্মত হয়েছে বিএনপি। জাতীয় ঐক্যমঞ্চের ব্যানারে অভিন্ন দাবি নিয়ে এখন রাজপথে নামতে চায় দলটি।
যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া যৌথভাবে তাদের যে দাবি ঘোষণা করেছে, সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি তারা চান নি। বিএনপি নেতারা বলছেন, এটা কোন সমস্যা নয়। ঘোষণার আগে এ নিয়ে তাদের সাথে বিএনপির কথা হয়েছে। এখন সবার বক্তব্য হচ্ছে, বর্তমান ব্যবস্থায় সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচন যেমন সম্ভব নয়, তেমনি শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থাকলে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়াও সম্ভব নয়। যেহেতু সবার সুর একই, তাই বিএনপির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট নেতাদের জানানো হয়েছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি তারা না চাইলেও জাতীয় ঐক্য গড়তে কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইলে যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের কোন বাধাও থাকবে না।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা কয়েকদিনে একাধিকবার বৈঠক করেছেন বৃহত্তর ঐক্য গঠন নিয়ে। জানা গেছে, এই ঐক্যের নেতা কে হবেন তা নিয়েও দলটি আলোচনা করেছে। যুক্তফ্রন্টে থাকা তিনটি দল এবং গণফোরামসহ অন্যান্য দল সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রহণযোগ্য কাউকে মনোনীত করলে বিএনপির তাতে আপত্তি থাকবে না।
ড. কামাল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নেতৃত্ব নির্ধারণ হবে যৌথ নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে। আর যেখানে অনেক রাজনৈতিক দল থাকবে, সেখানে দলীয় নেতৃত্ব থাকবে। কোন্ দল থেকে কে নেতৃত্ব দেবেন, সেটা সংশ্লিষ্ট দল ঠিক করবে। এটি একজন বা দু’জন করে হতে পারে।



