
ট্রাম্পের ওপরও শুল্কের চাপ, উদাহরণ কুক
ঘোষণাটা গত মঙ্গলবারের। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্তের ঘোষণা দেয় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প বলেছেন, ফেডের নেতৃত্বের তিনি পরিবর্তন চান। কারণ তারা সুদের হার কমানোর দাবির বিরুদ্ধে গিয়েছিল।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরখাস্তের ঘোষণার সময় লিসা কুকের বিরুদ্ধে বন্ধকি সম্পত্তি জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথম আফ্রিকান বংশোদ্ভূত নারী। তিন বছর আগে জো বাইডেনের সময় নিয়োগ পান। ট্রাম্প বলেছেন, কুককে অপসারণের ঘোষণা শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পরিবর্তন আনতে চাইছেন কেন, সুদহার কমাতেই বা কেন বেপরোয়া।
শুল্কনীতির পাল্টা আঘাত
ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেন গত ২ এপ্রিল। তাঁর আরোপ করা পারস্পরিক শুল্ক নীতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্য দেশের পণ্য ঢুকতে হলে বন্দরে নতুন নির্ধারিত শুল্ক আরোপ হবে। যে শুল্ক গুনতে হবে মার্কিন আমদানিকারকদের। তারা বাড়তি শুল্ক গুনলে স্বাভাবিকভাবেই তা আদায় করতে চাইবেন ভোক্তাদের কাছে থেকে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ঘোষণার পর মার্কিন বাজারে এমনটাই ঘটেছে।
পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প শুল্কনীতি ঘোষণার পর গত জুন মাস থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। মে মাসে ভোক্তা মূল্য সূচক বাড়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। জুন মাসে গড় ভোক্তা মূল্য সূচক বাড়ে ২ দশমিক ৭। এ অবস্থায় গৃহ, খাবার ও জ্বালানির পাশাপাশি, শুল্ক সংবেদনশীল পণ্য যেমন- পোশাক ও গৃহসজ্জার জিনিসপত্রের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এমন অবস্থায় দৃশ্যপটে আসে ফেডারেল রিজার্ভ। ফরচুন সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ট্যারিফের উল্টো প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাউজিং মার্কেটে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই খাতে স্থবিরতা দেখা দেওয়ার জন্য দায়ী করেন ফেডারেল রিজার্ভের উচ্চ সুদের হারকে। জুন থেকেই তিনি ফেডকে সুদের হার কমানোর চাপ দিতে শুরু করেন।
ট্রাম্প যুক্তি দেন, উচ্চ সুদের কারণে ভোক্তাদের দুর্ভোগ হচ্ছে। তবে ফরচুনকে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার ওয়ার্টন স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক জোয়াও গোমেজ বলেছেন, এখানে ট্রাম্পের আরেকটি লক্ষ্য থাকতে পারে। সেটি হলো সরকারের ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের সুদের বোঝা কমানো।
এখন লিসা কুককে ট্রাম্পের অপসারণ করতে চাওয়ার কারণ হলো, তিনি সুদের হার কমানোর বিরোধীতা করেছেন। ফেডের সুদের হার নির্ধারণ করার জন্য ১২ সদস্যের কমিটি আছে। লিসা কুক এই কমিটির একজন সদস্য। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, গত জুন থেকে ট্রাম্প সুদ হার কমানোর চাপ দিলেও তা মানেনি ফেড। কারণ লিসা কুক মূল্যস্ফীতির ওপর ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
ট্রাম্পের ক্ষমতা কতটুকু
লিসা কুককে বরখাস্তের ঘোষণা নিয়ে মঙ্গলবার সম্পাদকীয় লিখেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। সেখানে বলা হয়েছে, লিসা কুককে এভাবে বরখাস্তের চেষ্টা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এতে দেশের আইন অমান্য করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস (আইনসভা) ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে ১৯১৩ সালে। তখন প্রেসিডেন্টকে গভর্নর নিযুক্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের ইচ্ছামত বরখাস্ত করার অধিকার দেওয়া হয়নি। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, ট্রাম্প এই আইন মানাকে বাধ্যতামূলক মনে করছেন না। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন ফেডের নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে চান। কারণ তারা সুদের হার কমানোর দাবির বিরুদ্ধে গিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ করতে হলে আগে এর কারণ ও প্রমাণ উল্লেখ করতে হয়। ট্রাম্প কুকের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ দেখাননি। তাই নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের সম্পাদকীয়তে ট্রাম্পের উদ্দেশে লিখেছে, ‘হোয়ার ইজ ইওর এভিডেন্স, মিস্টার প্রেসিডেন্ট?’
লিসা কুক নিজে কি পদত্যাগে রাজি? মার্কিন গণমাধ্যমগুলো বলছে, না। কুক একটি বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে লিখেছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। তাঁকে বরখাস্ত করার জন্য কোনো আইনি কারণ নেই। সুতরাং প্রেসিডেন্ট নিজে এমন করতে পারেন না।
সুদহার কি কমবে
মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সুদহার কমার আভাস পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে ফেডের চেয়ারম্যান জেরমি পাওয়েল ব্যাংকারদের সম্মেলনে ভাষণ দেন। তাঁর ওই ভাষণে আভাস পাওয়া গেছে যে, সুদের হার কমার দিকে যাচ্ছে।
পাওয়েল উল্লেখ করেন, চাকরির বাজারের দুর্বলতা সম্ভবত ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির চাপকে ছাপিয়ে যাবে। এ অবস্থায় নীতি সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে।



