আন্তর্জাতিক

নেপালে এখন ওষুধ ও সুপেয় পানির সংকট, হাহাকার

বন্যার তাণ্ডব থেকে জীবন বাঁচানোই ছিল প্রথম লড়াই। সেই ধাক্কা সামলে উঠতেই এখন এক বড় সংকটের মুখোমুখি দুর্গতরা। ত্রিশূলী বাজারের বাসিন্দা রেখা দেবী গোসাইর কথাই ধরা যাক। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন তিনি। নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় বসতভিটা ও চারটি দোকান ভেসে গেছে। কোনো কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। গাড়ি-মোটরসাইকেলসহ সমস্ত মালামাল বানের জলে হারিয়ে গেছে। এখন পরিবারসহ ত্রিশূলী হাসপাতালের কাছের একটি আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছেন তিনি। কিন্তু হাসপাতালে মিলছে না প্রয়োজনীয় ওষুধ।

রেখা দেবীর ছেলে রঘুবীর বলেন, ‘মাকে প্রতিদিন নিয়ম করে ওষুধ খেতে হয়, কিন্তু হাসপাতালে তা পাওয়া যাচ্ছে না। তিনদিন ধরে মা কোনো ওষুধ পাচ্ছেন না।’

দুর্ভোগের শেষ এখানেই নয়। ওই আশ্রয়শিবিরে থাকা অবস্থায়ই রঘুবীরের শ্যালিকার প্রসববেদনা ওঠে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কাঠমান্ডু নিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বারবার আকুতির পর আজ শনিবার সকালে তাকে এয়ারলিফট করে কাঠমান্ডুর পরোপকার প্রসূতি ও নারী হাসপাতালে নেওয়া হয়।

একি দুর্ভোগ তাড়া করে বেড়াচ্ছে আরও অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবারকে। ঘরবাড়ি হারানোর পর প্রয়োজনীয় ওষুধ ছাড়া দিন কাটাচ্ছেন অনেক রোগী।

কোলানি আশ্রয়শিবিরে ৬২ বছর বয়সী মায়ের সেবা করছেন কপিলা পরিয়ার। তিনি জানান, তার মায়ের নিয়মিত দুই থেকে তিনটি ওষুধ লাগে, কিন্তু সব পাচ্ছেন না।
ওষুধের পাশাপাশি মিলছে না নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও।

কপিলা বলেন, ‘ক্যাম্পে পান করার মতো পানি নেই। বোতল পানি কেনার মতো অবস্থাও আমাদের নেই। টাকা-পয়সা, জামাকাপড় কিছুই নেই। কোলানি বাজারেও কেনার মতো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।’ বানের তোড়ে তার ১৬ বছরের ভাই অবিনাশ ও ৪৩ বছরের ননদ শান্তি ভেসে গেছেন, তারা এখনো নিখোঁজ।

চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভুগতে থাকা রোগীদের কোনো অবস্থাতেই নিয়মিত ওষুধ সেবন বন্ধ রাখা যাবে না। কিন্তু ত্রিশূলী হাসপাতালে দেখা দিয়েছে ওষুধের মারাত্মক সংকট।

হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানান, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ এখন একেবারেই নেই। ইন্টারনেট না থাকায় হাসপাতালের স্বাস্থ্যবিমা কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। মজুদ ওষুধও শেষ হয়ে আসছে।

ত্রিশূলী হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা জানান, নিকটবর্তী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া বহু বাস্তুচ্যুত মানুষের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও এজমা থাকলেও তারা প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না।

সংকট কেবল ওষুধেই সীমাবদ্ধ নেই। দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির অভাব। বন্যার কারণে হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকার পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আগে ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্যানেল থেকে পানি সংগ্রহ করা হলেও বন্যায় সেই ক্যানেলটি ধসে গেছে। এছাড়া তুপচে হয়ে আসা পানির মূল পাইপলাইনটিও বন্যায় ভেসে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে দুর্গত মানুষ নোংরা ও অনিরাপদ পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন।

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে আশ্রয়শিবিরগুলোতে দ্রুত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আরেকটি বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ত্রিশূলী হাসপাতালের পাশে ভাগতার এলাকায় তিনটি বড় আশ্রয়শিবির। ভৈরুং সেকেন্ডারি স্কুল, স্পোর্টস হল ও বেথান একাডেমিতে আশ্রয় নিয়েছেন হাজার খানেক মানুষ। তাদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রসূতি রয়েছেন। কিন্তু আশ্রয়শিবিরে পর্যাপ্ত পানি ও টয়লেট না থাকায় তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন।

ত্রিশূলী হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাজেন্দ্র লামা বলেন, ‘এত মানুষ একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার কারণে পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিরাপদ পানি ও সঠিক স্যানিটেশনের অভাবে যেকোনো সময় মহামারি দেখা দিতে পারে।’

শিবিরে থাকা লোকজনের অভিযোগ, যেটুকু খাবার দেওয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও পুষ্টিহীন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, প্রসূতি ও অসুস্থদের জন্য এই খাবার একেবারেই উপযোগী নয়।

এদিকে এলাকার সবকটি সেতু ভেঙে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে হাসপাতালের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে রোগী পরিবহন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। ডা. রাজেন্দ্র লামা জানান, জরুরি মুহূর্তে হেলিকপ্টার পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘কোনো রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হলে হেলিকপ্টার ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।’

এর ওপর যোগ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। ড. লামা জানান, হাসপাতাল ও আশপাশে মাত্র সাত থেকে আটজন পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, যা খুবই অপ্রতুল। ‘দিনের আলোতেই শুরু হয়েছে লুটপাট। দ্রুতই অতিরিক্ত পুলিশ প্রয়োজন, বলেন তিনি।

দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে কালোবাজারি সিন্ডিকেটও সক্রিয়। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এখন আকাশচুম্বী বলে জানান ডা. রাজেন্দ্র লামা।

সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension