মুক্তমতসাহিত্য

প্রথম পড়া ছোটদের উপন্যাস রামের সুমতি

হুমায়ূন কবীর ঢালী

আমার পড়া প্রথম ছোটদের উপন্যাস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রামের সুমতি’। ১৯৭৬ সালের কথা। তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। শরীফ উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে। বইটি পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল আমার জ্যাঠাত ভাই রুহুল আমীন। সে সম্ভবত ৮ম শ্রেণি থেকে ৯ম শ্রেণিতে ২য় বা ৩য় স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হওয়ায় এই বইটি পুরস্কার হিসেবে পায়। তখন শরীফ উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে মেধাবী ছাত্রদেরকে পুরস্কার হিসেবে বই দেওয়ার রীতি ছিল। এই রীতিটি চালু করেছিলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক রহীম স্যার। তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন সহকারি শিক্ষক নজরুল স্যার। নজরুল স্যার ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তিনি আমাদের প্যারেড ও স্কাউটস টিচারও ছিলেন।

‘রামের সুমতি’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হৃদয়স্পর্শী উপন্যাস। অবশ্য কেউ কেউ এটিকে উপন্যাস বলতে নারাজ। বড় গল্প হিসেবে বিবেচনা করেন।

রামের সুমতি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে। রেঙ্গুনে থাকাকালে ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে শরৎচন্দ্র একবার অফিসে এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। এই সময় মাতুল উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মারফত যমুনা-সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালের সঙ্গে একদিন তাঁর পরিচয় হয়। পরিচয় হলে ফণীবাবু তাঁর কাগজে লিখবার জন্য শরৎচন্দ্রকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে গিয়ে লেখা পাঠিয়ে দেবেন বলে কথা দেন।

ঐ কথা অনুযায়ী শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে গিয়ে তাঁর ‘রামের সুমতি’ গল্পটি পাঠিয়ে দেন। ফণীবাবু এই গল্প তাঁর কাগজে ১৩১৯ সালের ফাল্গুন ও চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশ করেন। রামের সুমতি যমুনায় প্রকাশিত হলে শরৎচন্দ্র এক গল্প লিখেই একজন মহাশক্তিশালী লেখক হিসাবে সাহিত্যিক ও পাঠক মহলে পরিচিত হন।

রামের সুমতি প্রকাশিত হলে তখন নবপ্রকাশিত ‘ভারতবর্ষ’ এবং সাহিত্য প্রভৃতি পত্রিকার কর্তৃপক্ষও তাঁদের কাগজের জন্য শরৎচন্দ্রের কাছে লেখা চাইতে থাকেন। শরৎচন্দ্র যমুনার সঙ্গে সঙ্গে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়ও লিখতে আরম্ভ করেন। শেষে যমুনা ছেড়ে কেবল ভারতবর্ষেই লিখতে থাকেন এবং ভারতবর্ষ পত্রিকার মালিক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স তাঁর বইও প্রকাশ করতে শুরু করেন।

রামের সুমতি উপন্যাসের প্রথম প্যারাটি পড়েই চমকে উঠেছিলাম— “রামলালের বয়স কম ছিল, কিন্তু দুষ্টুবুদ্ধি কম ছিল না। গ্রামের লোকে তাহাকে ভয় করিত। অত্যাচার যে তাহার কখন কোন্‌ দিক দিয়া কিভাবে দেখা দিবে, সে কথা কাহারও অনুমান করিবার জো ছিল না। তাহার বৈমাত্র বড়ভাই শ্যামলালকেও ঠিক শান্ত-প্রকৃতির লোক বলা চলে না, কিন্তু, সে লঘু অপরাধে গুরুদণ্ড করিত না। গ্রামের জমিদারী কাছারিতে সে কাজ করিত এবং নিজের জমিজমা তদারক করিত। তাহাদের অবস্থা সচ্ছল ছিল। পুকুর, বাগান, ধানজমি, দু’-দশ ঘর বাগদী প্রজা এবং কিছু নগদ টাকাও ছিল।শ্যামলালের পত্নী নারায়ণী যেবার প্রথম ঘর করিতে আসেন,—সে আজ তের বছরের কথা—সেই বছরে রামের বিধবা জননীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি আড়াই বৎসরের শিশু রাম এবং এই মস্ত সংসারটা তাঁহার তেরো বছরের বালিকা পুত্রবধূ নারায়ণীর হাতে তুলিয়া দিয়া যান।”

শুরু করে শেষ না হওয়া পর্যন্ত বইয়ে ডুবে ছিলাম। জীবনের প্রথম হাতে পাওয়া একটি উপন্যাস গোগ্রাসে পড়ে শেষ করেছিলাম। মূলত বই পড়ার প্রতি নেশা পেয়ে বসেছিল রামের সুমতি থেকেই।

রামের সুমতির কাহিনি সংক্ষেপ এইরকমঃ শ্যামলাল ও রামলাল সৎভাই। শ্যামলাল বয়সে রামের অনেক বড়। শ্যামলালের বউ নারায়নী আড়াই বছর বয়স থেকে রামকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। রামের কাছে বউদি মায়ের মতো। রামের বয়স ১৬। খুবই দুষ্টু সে। পাড়ার সকলেট মোটামুটি তার দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ। নারায়ণী একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। সাতদিন চলে গেলেও তার জ্বর কমে না। রামলাল ডাক্তারকে হুশিয়ারী দিয়ে আসে। ভাল কুইনান দিয়ে বউদির জ্বর না কমাতে পারলে তার আমবাগানের রক্ষা হবে না। এদিকে নারায়ণীর মা দিগম্বরী রামের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। সে রামের লাগানো অশ্বথ গাছ উপড়ে ফেলে। রামের দুইটি পোষা মাছ ছিলট– কার্তিক ও গনেশ। দিগম্বরী বাঘা মাঝিকে দিয়ে রামলালের পোষা একটি মাছ খাওয়ার জন্য ধরে। রামলাল এসব মেনে নিতে পারে না। একদিন সে রেগে গিয়ে বুড়ির দিকে পেয়ারা ছুড়ে মারে কিন্তু লাগে গিয়ে নারায়ণীর কপালে। এই ঘটনার পর শ্যামলাল দুই ভাইয়ের সম্পত্তি ভাগ করে ও নারায়ণীকে রামের সাথে কথা বলতে নিষেধ করে দেয়। আপনজন শূন্যতায় সে তার ভুলগুলো বুঝতে পারে ও তার সুমতি হয়।

রামের সুমতি’র প্রধান প্রধান চরিত্রগুলো হলো, রামলালঃ গ্রামের দুরন্ত কিশোর, শ্যামলালঃ রামের বড় ভাই, নারায়ণীঃ শ্যামলালের স্ত্রী, রামের বউদি, নৃত্যকালীঃ রামের বাড়ির ভৃত্য, দিগম্বরীঃ নারায়ণীর মা ও শ্যামলালের শ্বাশুড়ি, ভোলাঃ রামের একান্ত সহযোগী ও বাড়ির ভৃত্য, গোবিন্দঃ রামের ভাইপো, শ্যামলাল ও নারায়ণীর ছেলে।

রামের সুমতি গল্প অবলম্বনে ১৯৪৭ সালে ভারতে হিন্দি ও বাংলা উভয় ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। হিন্দি চলচ্চিত্রে রাম চরিত্রে অভিনয় করেন শাকুর ও বাংলা চলচ্চিত্রে রাম চরিত্রে অভিনয় করেন স্বগত, শ্যাম চরিত্রে জহর গাঙ্গুলি, নারায়ণী চরিত্রে মলিনা দেবী। এছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন ছবি রায়, প্রফুল্লবালা, রাজলক্ষী দেবী, শিশির ভট্টবল প্রমুখ।

পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে রামের সুমতি গল্প অবলম্বনে একই নামে বাংলাদেশেও একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন শহিদুল আমিন। এতে রাম চরিত্রে অভিনয় করেন শহিদুল আমিনের ছেলে জয়, শ্যাম চরিত্রে প্রবীর মিত্র, ও নারায়ণী চরিত্রে ববিতা। এছাড়াও অন্যান্য ভুমিকায় অভিনয় করেন রওশন জামিল, সুচন্দা, সাইফুদ্দিন, আশীষ কুমার লোহ, সাদেক বাচ্চু ও এটিএম শামসুজ্জামান প্রমুখ। এই চলচ্চিত্রে রাম চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জয় শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী ও তার বউদি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ববিতা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension