যুক্তরাষ্ট্র

বড়লোক হওয়ার নেশায় অপহরণ, জন্ম দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কুখ্যাত এক অপরাধকাণ্ড

১৯৬৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক দিন পরের কথা। ক্যালিফোর্নিয়া ও নেভাডার সীমান্তে লেক তাহোর হারাস ক্লাব লজ-এ গান গাইছিলেন ১৯ বছর বয়সী তরুণ গায়ক ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা জুনিয়র। তিনি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার ছেলে।

রাত তখন আনুমানিক ৯টা। নিজের সাজঘরে এক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন তরুণ সিনাত্রা। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ে এক লোক, দাবি করে একটি পার্সেল পৌঁছে দিতে এসেছে। দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকে পড়ে ব্যারি কিনান ও জো আমসলার নামের দুই তরুণ, যারা লস অ্যাঞ্জেলেসের হাইস্কুলের সাবেক সহপাঠী। টেপ দিয়ে সিনাত্রার বন্ধুকে বেঁধে এবং সিনাত্রা জুনিয়রের চোখে পট্টি জড়িয়ে তারা পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে রাখা গাড়িতে তুলে চম্পট দেয়।

বন্ধু কোনোমতে নিজেকে মুক্ত করে স্থানীয় পুলিশকে খবর দেন। বসানো হয় চারদিকে পুলিশি তল্লাশিচৌকি। পথিমধ্যে পুলিশ অপহৃত গাড়িটিকে থামায়ও, কিন্তু ধূর্ত অপহরণকারীরা পুলিশকে মিথ্যে বুঝিয়ে পার পেয়ে যায় এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলির ক্যানোগা পার্কের এক গোপন আস্তানায় গিয়ে আশ্রয় নেয়।

রাত ৯টা ৪০ মিনিটে রেনোতে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর অফিসে খবর যায়। গোয়েন্দারা রেনোতে পিতা ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বেল এয়ারে মা নান্সির সঙ্গে দেখা করেন। এফবিআই বুঝতে পারে এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করা। তারা সিনাত্রা পরিবারকে মুক্তিপণের কলের জন্য অপেক্ষা করতে বলে এবং পরামর্শ দেয় যে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে।

তিন অপহরণকারীতিন অপহরণকারী

৯ ডিসেম্বর রাতে মূল পরিকল্পনাকারী ব্যারি কিনান তাদের তৃতীয় সহযোগী জন আরউইনকে ফোন করেন, যিনি মুক্তিপণের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। আরউইন বয়োবৃদ্ধ সিনাত্রাকে ফোন করে নির্দেশনার জন্য তৈরি থাকতে বলেন। ১০ ডিসেম্বর তাদের তরফ থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বিশাল মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

কিংবদন্তি গায়ক ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা সিনিয়র তৎক্ষণাৎ টাকা জোগাড় করে এফবিআইয়ের হাতে তুলে দেন। গোয়েন্দারা সব নোটের ছবি তুলে রাখেন। ১১ ডিসেম্বর ভোরের আলো ফোটার আগে, পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যালিফোর্নিয়ার সেপুলভেডায় দুটি স্কুলবাসের মাঝখানে টাকার স্যুটকেসটি ফেলে আসা হয়।

কিনান ও আমসলার যখন টাকা তুলতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তৃতীয় সহযোগী আরউইন প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে পড়েন এবং অপহৃত সিনাত্রা জুনিয়রকে একা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বেল এয়ারে কয়েক মাইল হাঁটার পর একজন নিরাপত্তা প্রহরীর দেখা পান তরুণ সিনাত্রা। সাংবাদিকদের ভিড় এড়াতে সেই প্রহরীর টহল গাড়ির ট্রাঙ্কে করে তাকে মা নান্সির বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এফবিআইকে তরুণ সিনাত্রা জানান, চোখ বাঁধা থাকায় তিনি অপহরণকারীদের চেহারা খুব একটা দেখতে পাননি, কেবল তৃতীয় সহযোগীর কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন।

তদন্তে নেমে এফবিআই ক্যানোগা পার্কের সেই গোপন আস্তানা খুঁজে বের করে, যেখানে সিনাত্রাকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে এবং বন্ধুকে বাঁধার কাজে ব্যবহৃত টেপের রোল থেকে উদ্ধার করা হয় স্পষ্ট আঙুলের ছাপ।

সংবাদপত্রে এফবিআইয়ের অগ্রগতি দেখে ঘাবড়ে যান অপরাধীরা। সবার আগে ভেঙে পড়ে জন আরউইন তার ভাইয়ের কাছে পুরো ঘটনা স্বীকার করেন এবং তার ভাই সান ডিয়েগো এফবিআই অফিসে যোগাযোগ করেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যারি কিনান ও জো আমসলারকে গ্রেফতার করা হয় এবং উদ্ধার করা হয় প্রায় পুরো টাকাই।

আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী এটিকে প্রচারণার উদ্দেশ্যে সাজানো নাটক প্রমাণের চেষ্টা করলেও এফবিআইয়ের সংগৃহীত প্রমাণের সামনে তা ধোপে টেকেনি। সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল কিনানের নিজের লেখা একটি স্বীকারোক্তিমূলক চিঠি, যা তিনি আগেই এক ব্যাংকের সেফ-ডিপোজিট বক্সে রেখে এসেছিলেন। বিচারে ব্যারি কিনান, জো আমসলার এবং জন আরউইন তিনজনকেই দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেয় আদালত। আর এভাবেই সমাপ্তি ঘটে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রোমাঞ্চকর এক অপহরণ কাহিনীর।

সূত্র: এফবিআই

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension