প্রবাসবাংলাদেশ

বনানীর শ্বশুরবাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের লাশ: স্ত্রীর বন্ধু গ্রেফতার

রাজধানীর বনানীর শ্বশুরবাড়ি থেকে এক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার নাম শেখ শোয়েব সাজ্জাদ (৪৪)। জনপ্রিয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস অ্যামাজনে চাকরি করতেন তিনি। সাজ্জাদের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্ত্রী সাবরিনা শারমিন ও তার বন্ধু কাজী ফাহাদের বিরুদ্ধে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা হয়েছে। সাজ্জাদের পরিবারের পক্ষ থেকে পুরো ঘটনাটি ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসকে অবগত করা হয়েছে। শারমিনের বন্ধুকে শুক্রবার গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানায় পুলিশ। রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এক দিনের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। এদিকে সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন পলাতক। ৩০ এপ্রিল বিকালে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার বনানী ডিওএইচএসের মসজিদ গলির ১০৫ নম্বর বাসা থেকে শেখ শোয়েব সাজ্জাদের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। বাসাটি তার শ্বশুরের। ১৬ মার্চ তিনি ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে তিনি স্ত্রী সাবরিনা শারমিনকে (৩০) নিয়ে ওই বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেন।

মামলার বাদী ও সাজ্জাদের বড়ভাই শেখ সোহেল সায়াদ আহমেদ শনিবার গণমাধ্যমকে জানান, আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, সাজ্জাদের সঙ্গে ২০১৭ সালে সাবরিনার বিয়ে হয়। তারা দুজনই আমেরিকায় ছিলেন। ২০১৮ সালের দিকে সাবরিনা ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তিনি পুরান ঢাকার ওয়ারীর ১৯১নং বাসার পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করেন। এই বাসাটি সাজ্জাদের পরিবারের। এই বাসায় থাকাকালে পাশের বাসার কাজী ফাহাদ নামে এক তরুণের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান সাবরিনা। ফাহাদ নিয়মিত বাসায় আসতেন, যা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে ধরা পড়ে।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবরিনার বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সাজ্জাদের সঙ্গে ফোনে প্রায়ই ঝগড়া হতো। পারিবারিকভাবে ফাহাদকেও সতর্ক করা হয়। তার পরও তারা অনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখে, বিভিন্ন অজুহাতে ফাহাদ সাবরিনার ফ্ল্যাটে আসত। আমেরিকায় বসে এসব খবর শুনে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন সাজ্জাদ। প্রতিবেশী তরুণের সঙ্গে স্ত্রীর অনৈতিক সম্পর্কের কথা মহল্লায় ছড়িয়ে পড়লে তিনি সামাজিকভাবেও হেয় হন।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত ১৬ মার্চ দেশে আসেন সাজ্জাদ। দেশে এসেই সাজ্জাদ তার স্ত্রী সাবরিনাকে নিয়ে শ্বশুর শাখাওয়াত হোসেনের বনানীর ডিওএইচএসের বাসায় বসবাস শুরু করেন। এ সময় সাজ্জাদের মোবাইল ফোন ও পাসপোর্ট সরিয়ে নিজের কাছে নিয়ে রাখেন সাবরিনা। সাজ্জাদকে মানসিকভাবে চাপে রাখেন। মোবাইল ও পাসপোর্ট ফেরত না দিয়ে, সাবরিনা ১৫ এপ্রিল বাসা থেকে না বলে চলে যান। এ সময় তিনি ফাহাদের সঙ্গে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবরিনাকে সাজ্জাদের মোবাইল ও পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার জন্য তার বাবাও মোবাইল ফোনে অনুরোধ করেন। তবে কিছুই ফেরত দেওয়া হয়নি।

মানসিকভাবে এভাবে চাপে রাখায় সাজ্জাদ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাজ্জাদের বড় ভাই শেখ সোহেল সায়াদ আহমেদকে তার (সাজ্জাদের) শ্বশুর সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৩০ এপ্রিল বাসায় দুজন গৃহপরিচারিকা ও একজন গৃহপরিচারক ছিলেন। গাড়িচালক নিচে ছিলেন। ইফতারের ১০ মিনিট আগে গৃহপরিচারিকা সাজ্জাদকে ইফতারের জন্য ডাকতে থাকেন। তবে কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর ওই কক্ষের ডুপলিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে সাজ্জাদকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। তখন তিনি সাজ্জাদের পরিবার ও পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে লাশ নামিয়ে সুরতহাল করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠান। সাবরিনা ও সাজ্জাদ দু’জনেরই এটি দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম বিয়ে বিচ্ছেদের পর, দুজনই দুজনকে পছন্দ করে বিয়ে করেন। ১০ বছর ধরে সাজ্জাদ আমেরিকায় রয়েছেন। সাবরিনা শিক্ষার্থী ভিসায় আমেরিকা গেলেও তিনি ২০১৮ সালের মে মাসে ঢাকায় আসেন। এরপর আর আমেরিকা যাননি। তার আগের সংসারে এক কন্যাসন্তান রয়েছে।

সাজ্জাদের বড়ভাই শেখ সোহেল সায়াদ আহমেদ বলেন, কাজী ফাহাদের বাড়ি কুমিল্লায়। সে আগে কলাবাগান থাকত। সাবরিনার খালাতো ভাইয়ের পরিচয়ে আমাদের বাসায় আসত, আমরা তাই মনে করতাম। আবার সাবরিনা তার বাবার বাসায় যখন ফাহাদকে নিয়ে যেত তখন বলত, ফাহাদ আমাদের খালাতো ভাই। এভাবে দুই বাসায় ফাহাদকে নিয়ে যেত।

তিনি বলেন, একসময় দেখলাম ফাহাদ কলাবাগান থেকে শিফট হয়ে আমাদের পাশের বাসায় বাসা ভাড়া নেয়। তখন তার বাসায় আসা বেড়ে যায়। আমাদের বাড়ির পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে সাবরিনা তার আগের সংসারের মেয়ে নিয়ে একা থাকত। তার ছেলে বন্ধু-বান্ধব আসায় মুরব্বিরা বিরক্ত হতেন। বিষয়টি সবার চোখে লাগত।

সাবরিনার স্বজনরা জানিয়েছেন, সাবরিনার অভিযোগ ছিল শোয়েব তাকে সময় দিত না, বন্ধু-বান্ধবকে বেশি সময় দিত। এ নিয়েও তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো।

পুলিশের গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা আসামি কাজী ফাহাদকে গ্রেফতার করেছি। তবে এখনো এক নম্বর আসামি সাবরিনা পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শোয়েব আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত করে বলা যাবে বলে জানান তিনি।

সাজ্জাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সাজ্জাদকে যে সাবরিনা অত্যাচার করতেন তার প্রমাণ বেশ কয়েকটি কথোপকথনের স্ক্রিন শর্ট রয়েছে। কথোপকথন অনুযায়ী, সাবরিনা সবসময় টাকা দাবি করেছে সাজ্জাদের কাছে। এমনকি ‘কেমনে টাকা আদায় করতে হয় তা জানা আছে’ বলেও হুমকি দেয় সাজ্জাদকে। ‘ঢাকায় তোর ফ্লাট দখল করে নেব, কে বাঁচাতে আসে তাই দেখব। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ বলে হুমকি দেয় সাবরিনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাজ্জাদের মৃত্যুর পর থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। একপর্যায়ে ১ মে মামলা হলেও তদন্তে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়েনি। ৫ মে মার্কিন দূতাবাসে পুরো বিষয়টি জানানো হয়। পরে আসামি কাজী ফাহাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension