
বাংলাদেশে বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম
বিদ্যুতের পাইকারি দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও তাতে স্থির থাকতে পারছে না বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) করা রিভিউ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ দুপুর ১২টায় নতুন করে দাম ঘোষণা দিতে যাচ্ছে কমিশন। এতে বিদ্যুতের দাম কিছুটা হলেও বাড়তে পারে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ ও কমিশনের বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিইআরসির সদস্য (বিদ্যুৎ) মোহাম্মদ বজলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুতের দাম ঘোষণায় আগের আদেশে যেহেতু দাম বাড়েনি, তাই ওই আদেশে বিপিডিবির রিভিউ করার সুযোগ ছিল, তারা রিভিউ আবেদন করেছে। কমিশন বিপিডিবির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত রায় দেবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বাড়বে কিনা সে বিষয়ে স্পট করে কিছু বলেননি এ কর্মকর্তা।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ ও কমিশনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, বিদ্যুতের পাইকারি দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি গ্রাহকের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। তবে অন্য একটি সূত্র বলছে, ১৮-২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে মূল্য সমন্বয়ের কথা জানিয়েছিল বিপিডিবির সঙ্গে বৈঠকে। এছাড়া বিইআরসির সঙ্গে আইএমএফের প্রতিনিধি দল গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ পদ্ধতি এবং একাধিকবার দাম নির্ধারণ করতে পারবে কিনা সে বিষয়টি জানতে চেয়েছিল। ঋণ পেতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে হবে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিল আইএমএফ। বিপিডিবি ও বিইআরসি দুই পক্ষের সঙ্গে আইএমএফের বৈঠকের প্রায় দুই সপ্তাহের মাথায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি-সংক্রান্ত ঘোষণাটি সামনে এল।
জানা গিয়েছে, আইএমএফ সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড়ের যে শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো অন্যতম। এরই অংশ হিসেবে বিপিডিবি রিভিউ আবেদন করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগটি নিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়লেও এ মুহূর্তে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়বে না। কারণ বিতরণ কোম্পানিগুলো এখনো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়নি। তাই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এখনই বাড়ছে না। তবে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লে গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়বে, সে বিষয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলো এক প্রকার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এর আগে বিপিডিবি বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে বেশ কিছু ত্রুটি ছিল। এর মধ্যে তথ্য ঘাটতি ছিল একটি বড় বিষয়। এছাড়া পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দামের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তারও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিপিডিবি। এজন্য তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তখন দাম বাড়ানো হয়নি।
প্রসঙ্গত, বিপিডিবি গত ১২ জানুয়ারি বিদ্যুতের পাইকারি দাম পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব জমা দেয়। এরপর ১৮ মে তাদের প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হয়। ১৩ অক্টোবর দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দেয় কমিশন। তবে কমিশন সে সময় এ প্রস্তাবের বিপরীতে রিভিউ করার সুযোগ রেখে দেয় বিপিডিবির জন্য।
বিপিডিবি ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫৮ পয়সা করার আবেদন করে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ১৭ পয়সা। গ্যাসের আগের দর ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৪৫ পয়সা বিবেচনায় বিপিডিবি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির এ প্রস্তাব করেছিল। যদিও এরপর ইউনিটপ্রতি গ্যাসের দাম ৫৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। বিপিডিবির প্রস্তাবের বিপরীতে বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ভর্তুকি ছাড়া ৮ টাকা ১৬ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করে। এর আগে কখনো এত উচ্চহারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়ার নজির নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের পাইকারি দর ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ১৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
গত এক যুগে দেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে নয় দফা। এ সময়ে পাইকারি পর্যায়ে ১১৮ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ৯০ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় সরকারি ভর্তুকি ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ধরে পাইকারি পর্যায়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। একই সময়ে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।



