মুক্তমত

বাংলা শিশুসাহিত্যের অনন্য রূপকার সুখলতা রাও

হুমায়ূন কবীর ঢালী

আজ ৯ জুলাই—বাংলা শিশুসাহিত্যের অনন্য রূপকার, সমাজসেবী ও চিত্রশিল্পী সুখলতা রাওয়ের প্রয়াণ দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে নীরব ও নিভৃতে বিদায় নিয়েছিলেন সাহিত্যের এই রাজকন্যা। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ কন্যা এবং সুকুমার রায়ের সহোদরা দিদি হওয়ার সমান্তরালে, তিনি নিজের প্রতিভা, মনন ও কর্মের গুণে বাংলা সাহিত্য, সমাজ সংস্কার এবং শিশুশিক্ষার ইতিহাসে এক স্বমহিমায় উজ্জ্বল ও চিরস্মরণীয় নাম।
১৮৮৬ সালের ২৩ নভেম্বর কলকাতার এক বিখ্যাত সাহিত্যিক পরিবারে জন্ম নেন সুখলতা রাও। পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং মাতা বিধুমুখী দেবীর প্রথম সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁর নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল পিতার নান্দনিক ও অভিনব রসবোধ। সুখলতার জন্মের ঠিক পরের বছর, ১৮৮৭ সালে জন্ম নেন তাঁর ভাই সুকুমার রায়। সে বছরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল ‘বালক’ পত্রিকায়। সেই উপন্যাসের দুই বিখ্যাত চরিত্র ‘হাসি’ ও ‘তাতা’র নামানুসারেই সুখলতা ও সুকুমারের ডাকনাম রাখা হয়েছিল।
কলকাতার ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের যে তিনতলা বাড়িটিতে হাসি ও তাতার শৈশব কেটেছে, সেটি ছিল সেকালের শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও আধুনিক মুদ্রণশিল্পের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। সুর, ছবি আর লেখার আবহে বড় হওয়া ছ’ভাইবোনের দিনগুলো ছিল মায়ায় ঘেরা। সুখলতা রাও ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ধীরস্থির এবং অন্তর্মুখী প্রকৃতির—যা তাঁর ভাই সুকুমারের চঞ্চল ও ফুর্তিবাজ স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। পুণ্যলতা চক্রবর্তীর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, শৈশবে এক মারাত্মক অসুস্থতার কারণে কথা বলা এবং হাঁটতে শেখা ভুলে গিয়েছিলেন সুখলতা; পরে ছোট ভাই সুকুমারের সাথে সাথে তিনি পুনরায় সেসব রপ্ত করেন। হয়তো এই কারণেই তাঁর ব্যক্তিত্বের মাঝে এক ধরনের ভীরু, করুণ কিন্তু গভীর মমত্ববোধের জন্ম হয়েছিল। শৈশবের এক মিষ্টি উপাখ্যান তাঁর এই নরম অথচ অভিমানী মনের পরিচয় দেয়। একবার বাবা উপেন্দ্রকিশোর কোনো কারণে রেগে গিয়ে তাঁকে ঘর থেকে চলে যেতে বললে, পুঁচকে সুখলতা দু-হাতের বালা জোড়া বাবার সামনে তুলে ধরে প্রশ্ন করেছিলেন, “এই বালা দুটো কি খুলে রেখে যাব?” মেয়ের এমন নিষ্পাপ ও মায়াবী প্রশ্নে বাবার সব রাগ মুহূর্তে গলে জল হয়ে গিয়েছিল।


সুখলতা রাওয়ের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল তাঁদের বাড়ির বাইরের অংশে অবস্থিত ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে। সেখান থেকে সফলতার সাথে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি ভর্তি হন বেথুন কলেজে। এফ.এ পরীক্ষায় বৃত্তি পাওয়ার পর কন্যাগরবে মাতোয়ারা উপেন্দ্রকিশোর আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন মেয়েকে। এরপর ১৯০৩ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে বেথুন কলেজ থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি (বি.এ) লাভ করেন।
শুধু লেখালেখি নয়, সুখলতা রাওয়ের ভেতরের শিল্পীসত্তা প্রথম বিকশিত হয়েছিল রং-তুলির মাধ্যমে। বাবার অনুপ্রেরণায় জলরং ও তেলরং—উভয় মাধ্যমেই তিনি অসাধারণ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তৎকালীন সময়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে গড়ে ওঠা ‘বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট’ এবং বিখ্যাত পোর্ট্রেটশিল্পী শশী হেসের চিত্ররীতির গভীর প্রভাব ছিল সুখলতার ক্যানভাসে। তাঁর আঁকা ছবির লীলায়িত অবয়ব ও ভাবপ্রধান ভঙ্গি দর্শকদের মুগ্ধ করত। লেখার চেয়েও আগে তিনি চিত্রশিল্পী হিসেবে সমাদৃত হতে শুরু করেন। ১৯০৬-০৭ সালে কলকাতার ভারতীয় কৃষি ও কারিগরি প্রদর্শনীতে তেলরং বিভাগে এবং ১৯১০ সালে ইলাহাবাদের প্রদর্শনীতে জলরং বিভাগে তিনি পদক লাভ করেন। ঐতিহ্যবাহী ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তাঁর আঁকা ‘পূজারিণী’ ও ‘সাবিত্রী’র মতো চিত্রকর্ম প্রকাশিত হয়ে উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিল।
১৯০৭ সালে ওড়িশার কটকের বিখ্যাত চিকিৎসক জয়ন্ত রাওয়ের সাথে সুখলতা রাওয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয়। জয়ন্ত রাওয়ের পিতা মধুসূদন রাও ছিলেন ওড়িশার ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, কবি ও সমাজসংস্কারক। ওড়িশার মানুষ তাঁকে ‘ভক্তকবি’ বলে ডাকতেন। বাংলায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ যেমন, ওড়িয়া ভাষায় মধুসূদনের ‘বর্ণবোধ’ ছিল তেমনই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে বিয়ের পরও সুখলতা এক অত্যন্ত আলোকিত এবং সৃজনশীল পারিবারিক পরিবেশ লাভ করেন। স্বামীর সাথে কটকে দীর্ঘ প্রবাস জীবনেই সুখলতার সমাজসেবামূলক ও বহুমুখী সাংগঠনিক সত্তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। তিনি কেবল ঘরের কোণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ওড়িশার পিছিয়ে পড়া নারীদের শিক্ষা, স্বাবলম্বন এবং সমাজকল্যাণে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। কটকে তিনি গড়ে তোলেন ‘ভাই ও মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র’, ‘উড়িশা নারী সেবা সংঘ’ এবং অনাথ আশ্রম ও শিশু সদন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আহতদের সেবার জন্য তিনি রেড ক্রস সেবক বাহিনীও গঠন করেছিলেন। একই সাথে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ‘আলোক’ নামে একটি সমাজ ও সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন। সমাজসেবায় এই অসামান্য ও নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৫-৪৬ সালে তিনি এবং তাঁর স্বামী যৌথভাবে ভারত সরকারের সম্মানজনক ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদকে ভূষিত হন।
১৯১৩ সালে রায় পরিবারের ঐতিহাসিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’ প্রকাশের আগেই, ১৯১২ সালে সুখলতা রাওয়ের প্রথম বই ‘গল্পের বই’ প্রকাশিত হয়। ২০টি ভিনদেশি রূপকথাকে বাঙালি শিশুদের উপযোগী করে সহজ-সরল ভাষায় রূপান্তর করেছিলেন তিনি। বইটির ছবিগুলোও ছিল তাঁর নিজের আঁকা। ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রকাশের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিয়মিত এর জন্য লিখেছেন। সুকুমার রায়ের ‘প্রফেসর হুঁশিয়ার’ ডায়েরির অনুপ্রেরণায় তাঁর লেখা ও আঁকা কবিতা সিরিজ ‘ঘুমের ঘোরে’ (১৯২৩)-কে অনেকেই বাংলার প্রথম ‘কমিক স্ট্রিপ’ বা সচিত্র ধারাবাহিক গল্প বলে গণ্য করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুখলতা রাওয়ের লেখার ও ছবির বড় অনুরাগী ছিলেন। সুখলতা যখন ইংরেজিতে ‘বেহুলার গল্প’ অনুবাদ করেন, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তার ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কবির শতবর্ষে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘রাজা ও রানী’ এবং ‘জাপান যাত্রী’র উচ্চমানের ইংরেজি অনুবাদও করেছিলেন সুখলতা রাও। সুখলতা রাওয়ের শিশুসাহিত্যের মূল ভিত্তি ছিল শিশুদের মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে অনুধাবন করা। তিনি মনে করতেন, শিশুদের সাহিত্য হবে নির্মল, যেখানে কোনো প্রকার কুৎসিত বা হিংস্র ভাবের প্রশ্রয় থাকবে না। ১৯৩২ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘শিশুসাহিত্যে সুরুচি’ প্রবন্ধে তিনি ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র মতো সনাতন রূপকথার নিষ্ঠুর শাস্তি বা হিংস্র বর্ণনার সমালোচনা করে বলেন, কোমলমতি শিশুদের মনে ভয় বা বিদ্বেষ ছড়ায় এমন উপাদান বাদ দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
ছোটদের কেবল গল্প শোনানোই নয়, তাদের বুনিয়াদি শিক্ষার ভিত শক্ত করার জন্য সুখলতা রাও আজীবন কাজ করেছেন। বর্ণশিক্ষার জন্য তিনি এককভাবেই ৭টি চমৎকার বই লিখেছিলেন! ‘সহজ পাঠ’ বা ‘হাসিখুশি’র পাশাপাশি তাঁর ‘নিজে পড়’ এবং ‘নিজে শেখ’ বইগুলো বাংলার ঘরে ঘরে শৈশবের অচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ঘাসের মতো সবুজ, দুধের মতো সাদা আর গেরি মাটির মতো লাল রঙ দিয়ে জাতীয় পতাকার এমন সহজ ও নান্দনিক বর্ণনা আর কে-ই বা দিতে পারতেন! শিশুশিক্ষা সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘নিজে পড়’ গ্রন্থটির জন্য তিনি ‘লেখিকা পুরস্কার’ এবং ১৯৫৬ সালে ভারত সরকারের ‘সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘পড়াশুনা’ (১৯১৭), ‘স্বাস্থ্য’ (১৯২২), ‘নূতন পড়া’ (১৯২২), ‘সোনার ময়ূর’ (১৯৫২), ‘বিদেশী ছড়া’ (১৯৬২), ‘খেলার পড়া’ (১৯৬১), ‘গল্প আর গল্প’, ‘লালিভুলির দেশে’, ‘খোকা এলো বেড়িয়ে’, ‘ঈশপের গল্প’ এবং ‘হিতোপদেশের গল্প’। ওড়িয়া ভাষায় শিশুদের শিক্ষার জন্য তিনি ‘আপে পড়’ (১৯৬৪) নামে একটি বইও রচনা করেছিলেন।
সুখলতা রাও ওড়িশার লোকসংস্কৃতি, গান ও ছড়াকে পরম মমতায় বাংলায় অনুবাদ করে দুই প্রান্তের সংস্কৃতির মাঝে এক অটুট সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। কটকে অনুষ্ঠিত প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তিনি প্রাদেশিকতার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে পারস্পরিক আদানপ্রদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওড়িয়া সাহিত্যের কালজায়ী উপন্যাস ‘মাটির মনিষ’-এর চমৎকার বাংলা অনুবাদও (মাটির মানুষ) করেছিলেন তিনি।
পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিপুণা গৃহিণী। চমৎকার রান্না, ঘর সাজানো আর কেক-পুডিংয়ের ওপর ফুলপাতার নকশায় অতিথিদের মুগ্ধ করলেও, মনটি তাঁর পড়ে থাকত বইয়ের পাতা আর ক্যানভাসে। ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের অকালমৃত্যু এবং প্রিয় ভাই সুকুমারের চলে যাওয়ার মতো গভীর শোক তিনি সামলেছেন এক আধ্যাত্মিক ও তদ্‌গত মন নিয়ে।
১৯৫৬ সাল থেকে তিনি ও তাঁর স্বামী কলকাতার কিড স্ট্রিটে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে স্বামী জয়ন্ত রাওয়ের মৃত্যুর পর সুখলতা রাও নিজেও ক্যানসারে আক্রান্ত হন। রোগশয্যায় শুয়েও সৃষ্টির প্রতি তাঁর ব্যাকুলতা কমেনি। মৃত্যুর মাসখানেক আগেও অনুজপ্রতিম লীলা মজুমদারকে বলেছিলেন, “যেখানে যা আছে, যার যা কাজে লাগে, দিয়ে দে। নষ্ট হলে আমার কষ্ট হবে।” ১৯৬৯ সালের ৯ জুলাই, যখন কলকাতায় উপেন্দ্রকিশোরের গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রটি সাফল্যের সাথে চলছে, তখনই চিরঘুমের দেশে পাড়ি জমান এই মহীয়সী নারী। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা শিশুসাহিত্যের এই রাজকন্যার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁর রেখে যাওয়া সহজ পাঠের আলো আজও আমাদের শৈশবকে প্রদীপ্ত করে চলেছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension