বাংলাদেশ

বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা: বাবা বললেন, ‘কারও কাছে বিচার দেব না, আমরা বিচার পাব না’

খুলনায় ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজমল ওরফে আযমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের চারতলা একটি মেসে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছাত্রকে মারপিট করার পর চারতলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়।

নিহত আজমল ওরফে আযম (২৩) বেসরকারি খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র। সে মাত্র ১০ দিন আগে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। নিহত আজমল চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিন ও আসমা বেগমের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানা গছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের চারতলা ভবনের পুরোটাই ছাত্রদের মেস। এই মেসে ৫০–৬০ জন ছাত্র বসবাস করেন। আজমল চারতলার ডি-৮ কক্ষ ভাড়া নেন। এরপর থেকে সে ওই কক্ষে থাকত। চারতলায় মোট আটটি কক্ষ। ডি-২ কক্ষে থাকেন ওই মেসের ম্যানেজার এবং গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মেহেদী।

শুক্রবার রাতে মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলে আজমল। ভাত চুরি করে খাওয়ার অপবাদ দিয়ে মেহেদীসহ মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে ছাদে নিয়ে বেদম মারপিট করে। একপর্যায়ে ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে পেছনের ভবনসহ আশপাশের বাসিন্দারা তাকে নিচে পড়ে থাকতে দেখেন।

পরে ওই মেসের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর খবর শুনে ওই ছাত্ররা দ্রুত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে সটকে পড়ে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, নিহত আজমলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাঁর পা দুটিও ছিল ভাঙা।

আজ শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের চারতলা ভবনের ওই মেসে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ৮টি রুমের ৭টি কক্ষই তালাবদ্ধ। এর মধ্যে ডি-৮ রুমে থাকতেন আজমুল হোসেন। তবে ডি-১ কক্ষে নক করতেই বেরিয়ে আসেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লাবিব বিশ্বাস রাসেল।

রাসেল জানান, চুরির অভিযোগে মেহেদীসহ কয়েকজন আজমলকে ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মারপিট করা হয়। তবে সে কীভাবে মারা গেছে, তা জানি না।

তবে ছাদে গিয়ে দেখা গেছে, ছাদের একপাশে অনেক মানুষের পায়ের পাড়ায় ধুলাবালি ও শ্যাওলা সরে যাওয়ার চিহ্ন রয়েছে।

ওই মেসের কাজের বুয়া ফাতেমা বলেন, আজমুলের বিরুদ্ধে আগেও টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ রয়েছে। তবে শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ায় মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে মারধর করে। আমি নিষেধ করলেও তারা শোনেনি। পরে শুনেছি, সে মারা গেছে।

ওই মেসের পেছনের ভবনের একজন নারী বাসিন্দা জানান, শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে খুব জোরে একটি শব্দ হয়। দরজা খুলে বাইরে এসে দেখি, বাড়ির সামনে গলির মধ্যে একটি ছেলে পড়ে রয়েছে। পরে ছাত্ররা অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

এর আগে বেলা সাড়ে ১২টায় নগরীর হরিণটানা থানায় গিয়ে দেখা যায়, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সামনে বসে আছেন আজমুলের পিতা কুতুব উদ্দিন। পেছনের বেঞ্চে নির্বাকভাবে বসে আছেন মা চল্লিশোর্ধ্ব আসমা বেগম।

কুতুব উদ্দিন বলেন, তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে আজমুল। এক বছর আগে সে বাড়ি থেকে খুলনায় লেখাপড়ার জন্য আসে। গত বছর সে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে সে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে বাড়ি যায়।

শুক্রবার দুপুরে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসে। রাত ৯টার দিকে সে ফোন দিয়ে আমাদের সঙ্গে শেষ কথা বলে। তখন সে বলেছিল, ‘আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’ তিনি বলেন, রাত ১২টার পরে আমার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে বলে, ‘আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না।’ তখন তিনি বলেন, তাকে আমি বলি, ‘আমরা গরিব মানুষ, এক লাখ কোথায় পাব?’

তখন সে (অন্য ছেলেটা) বলে, ‘আপনি কী করেন?’ আমি তাকে বলি, ‘আমি কৃষিকাজ করি।’ তখন সেই ছেলে আবার বলে, ‘আপনি দ্রুত চলে আসেন।’ সেই সময় আমি বলি, ‘আমি ট্রেনে দ্রুত আসছি।’ তখন সে বলে, ‘আপনি ট্রেনে আসবেন, না বাসে আসবেন, না প্লেনে আসবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।’ তারপর সকালে এসে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।

সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ও ওসির সামনে চোখ মুছতে মুছতে বাবা বলেন, ‘ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেছে, তাই খুব খুশি হইছিলাম। যে ছেলে রাত ৯টায় কথা বলল, বলল ভালো আছি, আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। সেই ছেলেকেই অন্য ছাত্ররা পিটিয়ে মেরে ফেলল। আমি কার কাছে বিচার দেব? আমি কারও কাছে বিচার দেব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আমরা বিচার পাব না। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। আল্লাহই বিচার করবেন।’

হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ঘটনাটি আমরা তদন্ত করছি। নিহত আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশই বাদী হয়ে মামলা করবে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা যা করা যায়, আমরা তাই করব।

খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. কানাই লাল সরকার বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর আজমল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তার সম্পর্কে আমরা তেমন কিছু জানি না। আমরা তার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তাঁদের জানিয়েছি, আপনারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা করব।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension