
অগ্নিঝরা মার্চমুক্তিযুদ্ধস্বাধীনতা
বিশ্ব জনমত গঠনে তাজউদ্দিনের বিবৃতি
জাকির হোসেন
কন্ট্রোল রুম চালু
একাত্তরের ৫ মার্চ (শুক্রবার) ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে ডাকা লাগাতার হরতাল ও বিক্ষোভের চতুর্থ দিন। স্বতঃস্ফূর্ত সেই হরতালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। গত কয়েক দিনের হরতালে এদিন পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে চট্টগ্রামে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২২ জনে। স্বাধীনতার লক্ষ্যে এই দুর্নিবার আন্দোলনে শহীদদের জন্য ৫ মার্চ সারা দেশের মসজিদে মসজিদে দোয়া করা হয়। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য অধীর আগ্রহ, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে সারা দেশের মানুষ। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য ঢাকায় একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়।
এদিন টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ৪ শ্রমিক, আহত হন আরো অন্তত ৩০ জন। তবে শহর থেকে এদিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়। গণহত্যার প্রতিবাদে বিশ্ব জনমত গঠনের লক্ষ্যে বিবৃতি প্রদান করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ। আর নিউ মার্কেটে মোজাফফর আহমদের সভাপতিত্বে ন্যাপ ওয়ালির জনসভায় আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে। রাতে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার ধানমণ্ডির বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৫ মিনিট আলোচনা হয়।
পরদিন ৬ মার্চ (শনিবার) প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। এ দিন (৬ মার্চ, শনিবার) দৈনিক ইত্তেফাক ৫ মার্চের (শুক্রবার) আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদের বিবৃতি ‘বাংলার বুকে এ গণহত্যা বন্ধ কর!’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৬ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়া ইত্তেফাক ‘টঙ্গীতে গুলীবর্ষণে ৪ জন নিহত, ২৫ জন আহত’, ‘শেখ মুজিব সকাশে আসগর খান’, ‘কল্পনার ফানুস’ শেখ মুজিব, ‘শেখ মুজিবের ভাষণ রিলে করিতে হইবে- ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি তোফায়েল আহমদ’ শিরোনামে ৫ মার্চের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।

দৈনিক আজাদ এদিন ‘অনূন্য ৪ জন নিহত, ৩০ ব্যক্তি আহত: টঙ্গীতে গুলীবর্ষণ ’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। আজাদ-এ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত অন্য সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল, ‘আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দিনের বিবৃতি: বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঁচিতে চায়’, ‘স্বাধীকার আন্দোলনের পঞ্চম দিবস: বাংলাদেশ ব্যাপী হরতাল’
সংবাদ এদিন ‘টঙ্গীতে শ্রমিকদের ওপর সেনাবাহিনীর গুলীতে ২ জন নিহত ’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। এ ছাড়াও সংবাদ ‘আজ ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণ’ ‘শেখ মুজিব সকাশে আসগর খান’ ‘শহর হইতে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার’ অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ও সৈয়দ আলতাফের বিবৃতি: এ হেন গণহত্যায় পরিবেশ শান্ত থাকিবে না’ শিরোনামের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
‘৭১-এর ৬ মার্চ (শনিবার) দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হল:
বাংলার বুকে এ গণহত্যা বন্ধ কর!
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দিন আহমদ গতকাল (শুক্রবার) বলেন যে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট এবং বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে মিলিটারীর বুলেটে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষ-শ্রমিক কৃষক ও ছাত্রদের ধরাশায়ী করা হইতেছে। অবিলম্বে এই নরহত্যা বন্ধ করিতে হইবে। যাহারা এই ঘটনার জন্য দায়ী তাহাদের জানা উচিত যে, নির্বিচারে নিরীহ মানুষকে এভাবে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছু নয়।
এক বিবৃতিতে জনাব তাজউদ্দিন বলেন যে, বাংলাদেশের মানুষকে মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করা এবং বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের উপনিবেশ ও বাজার হিসেবে শোষণের গূঢ় রাজনৈতিক মতলবে বেসামরিক অধিবাসীকে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করা হইতেছে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান হইতে হাজার হাজার লোকের হতাহতের খবর আসিয়া পৌঁছিতেছে। আমরা সৈন্যবাহিনীর লোকেদের এই গর্হিত আচরণের তীব্র নিন্দা করিতেছি। শুধু বিদেশী আক্রমণের মোকাবিলায় দেশ রক্ষার জন্যই সৈন্যবাহিনী তাহাদের অস্ত্র ব্যবহার করিতে পারে- নিরস্ত্র দেশবাসীর উপর নয়।

বাংলাদেশের নিরস্ত্র বেসামরিক লোকেদের উপর এই নগ্ন শক্তি প্রয়োগ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে সৎ চিন্তাশীল ব্যক্তিদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানান। জনাব তাজউদ্দিন বলেন, সামরিক বাহিনীর যে অস্ত্র দেশ রক্ষায় বিদেশী হানাদারের উপর ব্যবহার করার কথা, এক্ষণে উহা বাংলাদেশের বেসামরিক লোকেদের ভয়ভীতি দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হইতেছে। বাংলাদেশের মানুষকে মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত রাখা, বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ ও বাজার হিসেবে শোষণ করা এবং বাংলাদেশের উপর ঔপনিবেশিক শাসন চিরস্থায়ী করার গূঢ় রাজনৈতিক মতলবেই এইরূপ ভয়ভীতি দেখানো হইতেছে। সামরিক শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এ কথা বোঝা যাইতেছে যে, এই নির্যাতনমূলক নীতি জোরদার করা হইবে।
বিশ্ববাসী জানিয়া রাখুন!
‘বিশ্ববাসী জানিয়া রাখুন, বাংলাদেশের মানুষের উপর আজ যে নির্যাতন নামিয়া আসিয়াছে, তাহার বীরের মতো উহা প্রতিরোধ করিতেছে। আজ আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ মুক্তি অর্জন এবং একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঁচিয়া থাকার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ’। এ পি পি
শেখ মুজিব সকাশে
আসগর খান
স্টাফ রিপোর্টার: অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান গতকাল (শুক্রবার) রাতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শেষোক্তের ধানমণ্ডির বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট আলোচনা করেন।
অপেক্ষমান সাংবাদিকদের তিনি শেখ সাহেবের সঙ্গে তাহার আলোচনা সম্পর্কে কিছুই বলেন নাই। তিনি জানান যে, তিনি আজ (শনিবার) প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের পর পুনরায় শেখ সাহেবের সঙ্গে বিকালে সাক্ষাৎ করিবেন। জনাব আসগর খান জানান যে, পশ্চিম পাকিস্তান রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হইবেন।
প্রসঙ্গত, গণঐক্য আন্দোলনের প্রধান (অবসরপ্রাপ্ত) এয়ার মার্শাল আসগর খান গতকাল বিকালে করাচি হইতে ঢাকায় পৌঁছান।

টঙ্গীতে গুলীবর্ষণে ৪ জন
নিহত, ২৫ জন আহত
স্টাফ রিপোর্টার: শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত সশস্ত্র বাহিনীর গুলীতে গতকাল (শুক্রবার) টঙ্গী শিল্প এলাকায় ৪ ব্যক্তির মৃত্যু ও ২৫ ব্যক্তি আহত হইয়াছে। বর্তমানে সমগ্র টঙ্গী এলাকায় প্রবল উত্তেজনা বিরাজ করিতেছে।
স্থানীয় কোনো ব্যক্তির মতে সশস্ত্র বাহিনীর লোকেরা দফায় দফায় ৬২ রাউন্ড গুলীবর্ষণ করে এবং এই গুলীবর্ষণের শব্দে টঙ্গী শিল্প এলাকা প্রকম্পিত হইতে থাকে। বেসরকারী সূত্রে হতাহতের সংখ্যা বেশি বলিয়া দাবি করা হয়। টঙ্গী থানার অফিসার ইনচার্জসহ তিন পুলিশ কর্মচারীও আহত হয়। শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত সশস্ত্র বাহিনীর এই বেপরোয়া গুলীবর্ষণের পর উত্তেজিত জনতা কাঠের ব্রিজ পুড়াইয়া দেয় এবং সিএন্ডবি ব্রিজটি বড় বড় গাছপালা ফেলিয়া বন্ধ করিয়া দেয়। পরে সামরিক বাহিনীর লোকেরা ব্রিজের গাছপালা অপসারণ করিয়া রাস্তা পরিষ্কার করে। টঙ্গী ব্রিজে বর্তমানে সেনা মোতায়েন রহিয়াছে।…
গুলীতে যাহারা নিহত হইয়াছেন তাহার হইতেছেন : ১. আব্দুল মতিন (৩০) পিতা: হাজী আব্দুল আজিজ, পেশা: শ্রমিক, চান্দা ব্যাটারী, দেশের বাড়ী কুতুবপুর, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী। ২. রফিজ উদ্দিন (২৫) পেশা: শ্রমিক, চান্দা ব্যাপারী। ৩. আব্দুল মিয়া (৩৫) পেশা : শ্রমিক, অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিল, দেশের বাড়ী মানিকগঞ্জ, ঢাকা।
শেখ মুজিবের ভাষণ
রিলে করিতে হইবে
ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি
তোফায়েল আহমদ
স্টাফ রিপোর্টার: ১১ দফা আন্দোলনের অগ্রনায়ক এবং তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ আগামীকাল রবিবার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দান করিবেন উহা সরাসরি রিলে করার জন্য ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। গতকাল (শুক্রবার) এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই সংকটময় মুহূর্তে স্বাধীকারকামী বাংলার গণমানুষ তাদের মুক্তি আন্দোলনের অবিসংবাদিত মহানায়কের নির্দেশের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করিতেছেন। শেখ সাহেব রেসকোর্সে কী বলেন, তার প্রতিটি কথা বাংলার মানুষ দূর দূরান্তে বসিয়াই শুনিতে চায়।
তিনি বলেন, ঢাকা বেতার কেন্দ্র জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই যে করিয়াই হোক ঢাকা বেতার কেন্দ্রকে শেখ সাহেবের রেসকোর্সের ভাষণ রিলে করিতে হইবে। তিনি বলেন, এ দাবি এখন সমগ্র বাঙালি জাতির দাবি।



