
বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস আজ: আট আগ্রাসনে ধুঁকছে সুন্দরবন
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন। পৃথিবীর বেশির ভাগ ম্যানগ্রোভ বনে দুই থেকে তিন প্রজাতির শ্বাসমূল রয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনে ছয় ধরনের শ্বাসমূল রয়েছে, যা বনটিকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। তবে এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক ফুট ওপরে অবস্থিত। তাই জলবায়ু সংকট প্রকট হয়ে ওঠায় এ বনভূমির ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে।
চার দশক ধরে সুন্দরবনে উত্তর থেকে আসা স্বাদুপানির পরিমাণ কমেছে, লোনাপানির প্রবাহ বেড়েছে। এতে লোনাপানি-সহিষ্ণু গাছ ও লতাগুল্মের প্রজাতি টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়লেও ঝুঁকিতে পড়েছে স্বাদুপানি-সহিষ্ণু প্রজাতিগুলো।
কয়েক বছর ধরেই সুন্দরবন দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকির কথা জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কমপক্ষে আট ধরনের আগ্রাসনের শিকার হয়ে হুমকির মুখে পড়েছে এ ম্যানগ্রোভ বন।
বৃহত্তর খুলনা (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা) জেলার গেজেটিয়ার লেখার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। ১৯৭৮ সালে ছাপা ওই গেজেটিয়ারে বলা হয়েছিল, নির্বিচার বনসম্পদ লুট ও প্রাণী হত্যা বন্ধ না হলে সুন্দরবন বিবর্ণ, বৃক্ষলতাহীন, প্রাণহীন হয়ে পড়বে।
পাঁচ দশক পর পরিস্থিতি ততটা মারাত্মক না হলেও সুন্দরবনের প্রাণপ্রাচুর্য কমছে। গবেষকরা বলছেন, সুন্দরবনের কিছু গাছ, প্রাণী ও পাখি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রকৃতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে সুন্দরবন থেকে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ ধরনের স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা মাছ ও গাছের প্রজাতির বর্ণনাও
তাতে আছে।
এমন বাস্তবতায় আজ সারা বিশ্বের মতো দেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস। ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ও এর টেকসই সংরক্ষণের প্রচারের লক্ষ্যে প্রতি বছরের ২৬ জুলাই দিবসটি পালন করা হয়। ২০১৫ সালের সাধারণ অধিবেশনে ইউনেস্কো দিনটিকে স্বীকৃতি দেয়।
ষোড়শ শতাব্দীতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরি বইয়ে কুষ্টিয়া ও যশোর পর্যন্ত সুন্দরবনের বিস্তৃতির কথা উল্লেখ করেছেন। ১৭৭৬ সালে বাংলাদেশ অংশের বিস্তার ছিল ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। ২০১৬ সালের এক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ অংশের বিস্তার ৬ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের কাছেই গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রিসোর্টগুলো হয়ে উঠেছে বড় ক্ষতির কারণ। নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, প্লাস্টিকের দূষণ, বনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ও পণ্যবাহী জাহাজডুবির ভয়াবহ প্রভাবও পড়ছে। থেমে নেই বিষ দিয়ে মাছ ধরা, মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, গাছ কাটা, আগুন দেয়া ও বন্যপ্রাণী শিকার। সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের নদী, মাটি, গাছপালা ও প্রাণীর ওপর।
সরকার সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য ও চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, এসব এলাকায় শিল্প-কারখানা স্থাপন নিষেধ রয়েছে। এরপর সেখানে কারখানা স্থাপন থামানো যাচ্ছে না।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলছেন, সুন্দরবনকে রক্ষায় এর চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করেছিল সরকার। গত ১০ বছরে সুন্দরবনের কাছেই উঠেছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপি গ্যাস প্লান্ট, অয়েল রিফাইনারিসহ প্রায় ৫০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এমনকি বনের খুব কাছে বিশালাকৃতির গুদাম নির্মাণ করেছে খাদ্য বিভাগ।
অধ্যাপক হারুন বলেন, ‘কারখানাগুলোর অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি ফেলা হয় নদীতে, যা ছোট ছোট খালের মাধ্যমে সুন্দরবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পানি ও মাটিকে দূষিত করছে। এতে বনের অনেক স্থানে আগের মতো চারা গজাচ্ছে না। নদীর পানিতে তেলের পরিমাণ বাড়ায় হুমকিতে পড়েছে জলজ প্রাণী।’
তিনি আরো বলেন, ‘তীব্র প্রতিবাদ উপেক্ষা করে বনের কাছেই ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর চালু করা হয় রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন সুন্দরবনের ক্ষতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশোধন ছাড়াই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির দূষিত পানি সুন্দরবনের মইদারা ও পশুর নদে ফেলা হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধোঁয়া ও নদীতে ফেলা বর্জ্য সুন্দরবনের বড় ক্ষতি করছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে বন অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে দাবি করে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে সার্বিকভাবে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর পরিমাণ বেড়েছে। বাঘের সংখ্যার পাশাপাশি বাঘ যেসব প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলোর পরিমাণও বেড়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সুন্দরবন সুরক্ষায় বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।’



