আন্তর্জাতিক

ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানল ‘নিয়ন্ত্রণহীন’, তিন লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া

বোর্দোতে ছুটি কাটাতে যাওয়া ব্রিটিশ দম্পতি মেইজি ও ক্যালেব জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মেইজি বলেন, ‘প্রথমে মনে হয়েছিল কেউ বারবিকিউ করছে।’ ক্যালেব বলেন, ‘ছাই এসে পুরো সুইমিং পুল ঢেকে দিয়েছে, বাইরে হাঁটলে পা কালো হয়ে যাচ্ছে।’ সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া ‘ফুসফুসে ধাক্কা দিচ্ছে’ বলেও জানান তারা

ফ্রান্স ও স্পেনে কয়েক দিন ধরে জ্বলতে থাকা দাবানলের কারণে ৩ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। দেশ দুটিতে তীব্র গরম ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে অগ্নিনির্বাপন ব্যাহত হচ্ছে। খবর বিবিসি।

স্পেনে জরুরি অবস্থা জারি হলেও মাদ্রিদের বাইরে আবহাওয়ার কিছুটা পরিবর্তন দমকলকর্মীদের সহায়তা করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস বলেছেন, ‘আমাদের সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।’

ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলে এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সত্তরোর্ধ্ব ওই ব্যক্তিকে মানিসেস এলাকার সাল্ট দে ল’আইগুয়া গিরিখাতে আগুন নেভানোর সময় তার গাড়ির ভেতর মৃত অবস্থায় পান দমকলকর্মীরা।

ফ্রান্সে শনিবার গভীর রাতে আরো ৫৫ হাজার মানুষকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ফলে জিরোন্দ ও লঁদ অঞ্চলে সরিয়ে নেয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় আড়াই লাখে পৌঁছেছে।

দমকল বাহিনীর অধিনায়ক নিকোলা ব্রাজ বলেন, আগুন ‘নিজস্ব বায়ুপ্রবাহ তৈরি করেছে, এমনকি ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘূর্ণাবর্তও সৃষ্টি হয়েছে’। তার ভাষায়, পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণহীন ও অপ্রত্যাশিত’ হয়ে উঠেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামনে ‘আরেকটি কঠিন রাত’ অপেক্ষা করছে।

এদিকে আগুন মোকাবেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে ফ্রান্স। সেখানে সেনারা ঝোপঝাড় পরিষ্কার ও আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফায়ারব্রেক তৈরির কাজ করছেন।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ‘যত দিন প্রয়োজন, তত দিন জনগণের পাশে থাকবে’ সরকার।

গতকাল বোর্দোর দিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। শহরের বাসিন্দারা বাতাসে তীব্র পোড়া গন্ধ অনুভব করেন। বোর্দো থেকে পালিয়ে যাওয়া পর্যটক স্পেন্সার র‌্যান্ডাল বলেন, ‘প্রবল বাতাস আগুনকে উসকে দিচ্ছে, বিষয়টি সত্যিই ভয়ঙ্কর।’ তিনি জানান, পরিবার নিয়ে প্রায় ১০০ মাইল দূরে সরে গেলেও এখনো তারা দাবানলের গন্ধ পাচ্ছেন।

বোর্দোতে ছুটি কাটাতে যাওয়া ব্রিটিশ দম্পতি মেইজি ও ক্যালেব জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মেইজি বলেন, ‘প্রথমে মনে হয়েছিল কেউ বারবিকিউ করছে।’ ক্যালেব বলেন, ‘ছাই এসে পুরো সুইমিং পুল ঢেকে দিয়েছে, বাইরে হাঁটলে পা কালো হয়ে যাচ্ছে।’ সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া ‘ফুসফুসে ধাক্কা দিচ্ছে’ বলেও জানান তারা।

দাবানলের কারণে নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠাতে টুর দ্য ফ্রান্সের শেষ ধাপের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে।

মাখোঁ মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছেন। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৩০টি বড় আগুন জ্বলছে, যাকে সরকার ‘সম্পূর্ণ নজিরবিহীন’ পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেছে।

স্পেনে মাদ্রিদের কাছেও আগুন জ্বলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফের্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা বলেন, বাতাসের ঝাপটা আগুনকে দক্ষিণ দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং ‘রাতটা মোটেও ইতিবাচক হবে না।’

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আরো ২৮ হাজার মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকতে বলা হয়েছে। শনিবার গভীর রাতে তোলেদোর কাছে অন্তত আটটি পৌরসভাকেও খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়।

পেদ্রো সানচেস জানান, চলতি বছর স্পেনে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে, যেখানে গত এক দশকে দেশটির বার্ষিক গড় ছিল ১ লাখ হেক্টর। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ন্যুনেজ বলেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশটিতে ৯৮ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।

এদিকে ইতালির সিসিলি দ্বীপেও ৩৫০টির বেশি আগুন লেগেছে, যার মধ্যে অন্তত ১০টি বড় অগ্নিকাণ্ড। সেখানেও বহু মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কে ১০ দিন ধরে জ্বলতে থাকা দাবানল নিয়ন্ত্রণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিশনার হাদজা লাহবিব বলেছেন, এ বছর ইউরোপে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি জানান, গত বছর গ্রীষ্মে ১০ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গিয়েছিল এবং এ বছর আগুনের মৌসুম আরো আগেই শুরু হয়েছে।

তার ভাষায়, ‘আবহাওয়া পূর্বাভাস বলছে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামনে আরো তাপপ্রবাহ আসতে পারে। ফলে নতুন নতুন দাবানল দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

ফ্রান্স ইইউর সিভিল প্রোটেকশন মেকানিজম সক্রিয় করেছে। এর আওতায় ক্রোয়েশিয়া থেকে তিনটি কানাডেয়ার বিমান, পর্তুগাল থেকে দুটি এয়ার ট্র্যাক্টর, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া থেকে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং রোমানিয়ার ৪০ সদস্যের বন আগুন নেভানোর দল ফ্রান্সে পাঠানো হচ্ছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লিয়েন জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অগ্নিনির্বাপণ বহর থেকে আরো ১১টি উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার ফ্রান্স ও স্পেনে পাঠানো হয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension