আন্তর্জাতিক

অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবার আনার সুযোগ বন্ধের ঘোষণা

অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ে আসার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার নতুন এ নিয়ম ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। এর আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, তথাকথিত ‘ভিসা হপার’ এবং ব্যাকপ্যাকারদের জন্যও বিভিন্ন নিয়ম কঠোর করা হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি শিক্ষার্থীরা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় সঙ্গে আনতে পারবেন না। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের মেয়াদ বাড়াতে চাইলে তাদের উচ্চতর কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের পথ বেছে নিতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, আমরা আর এমন কোনো ব্যবস্থা রাখব না যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন।

তবে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত বিদেশি শিক্ষার্থী এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এই নিয়মে কিছু ছাড় থাকবে। পিএইচডি শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারকে সঙ্গে আনতে পারবেন। বার্ক বলেন, স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জীবন ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

‘অভিবাসন কর্মসূচি পরিচালনার কাজ: কারা আসেন, কারা থেকে যান এবং কারা চলে যান’ শিরোনামে দেওয়া এক বক্তৃতায় বার্ক এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০২৮ সালের মধ্যে নিট অভিবাসীর সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা।

স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে ‘ভিসা হপিং’ বা ঘন ঘন ভিসা পরিবর্তনের প্রবণতাও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থী একটি কোর্স শেষ করার পর আরেকটি কোর্সে ভর্তির আবেদন করেন, যা অনেক সময় আগেরটির চেয়ে নিম্নমানের যোগ্যতার হয়। এমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করা হয়, যার বৈধতা বা মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তবে যারা উচ্চতর শিক্ষার দিকে এগোতে চান, যেমন স্নাতক ডিগ্রি শেষ করে স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স করতে চান, তাদের ক্ষেত্রে অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানান বার্ক।

১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের জন্য প্রযোজ্য ‘ওয়ার্কিং হলিডে ভিসা’র নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাধারণত ব্যাকপ্যাকাররা এই ভিসা ব্যবহার করেন। এতে অস্ট্রেলিয়ায় ১২ মাস কাজ করার সুযোগ থাকে এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর পর্যন্ত থাকার সুযোগ রয়েছে। কৃষি খাতেও এই ভিসাধারীরা গুরুত্বপূর্ণ শ্রমের উৎস।

বর্তমানে দ্বিতীয় বছরের ভিসার যোগ্য হতে হলে প্রথম বছরে অস্ট্রেলিয়ার আঞ্চলিক এলাকায় তিন মাস কাজ করতে হয়। তৃতীয় বছরের যোগ্যতার জন্য কাজ করতে হয় ছয় মাস। নতুন নিয়মে দ্বিতীয় বছরের জন্য যোগ্যদের একটি ব্যালট বা লটারি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এতে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার জনের সুযোগ থাকবে, যা গত বছর ৫৭ হাজার ছিল।

তৃতীয় বছরের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা কমিয়ে ৫ হাজার করা হয়েছে। গত বছর ৩১ হাজার মানুষ তৃতীয় বছরের ভিসার জন্য যোগ্য হয়েছিলেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে ব্রিটিশ ওয়ার্কিং হলিডে-মেকাররা এসব পরিবর্তনের আওতায় পড়বেন না।

বার্ক বলেন, অভিবাসন অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি ‘শক্তি’ বা ইতিবাচক দিক হলেও এর ওপর ‘উচ্চ মাত্রার নিয়ন্ত্রণ’ থাকা প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস প্রকাশিত নতুন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ১২ মাসে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ৭৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যুর পাশাপাশি নিট অভিবাসন হিসেবে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০ জনের হিসাবও রয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া এবং জনসেবার ওপর বাড়তি চাপের কারণে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে অভিবাসন দেশটির বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে রয়েছে।

অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী দল ‘ওয়ান নেশন’ চলতি সপ্তাহের শুরুতে তাদের অভিবাসন নীতি প্রকাশ করেছে। এতে তিন বছরের মধ্যে অস্থায়ী অভিবাসী ভিসার সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজার কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গত মে মাসে নিম্নকক্ষে দলটি তাদের প্রথম আসন জয় করে।

দলটি নিট বৈদেশিক অভিবাসনের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারে সীমাবদ্ধ রাখারও প্রস্তাব দিয়েছে। বার্ক এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেছেন, এমন পদক্ষেপ নিলে তা ‘অস্ট্রেলীয় অর্থনীতির কিছু অংশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে’।

জুলাই মাসে সরকার একটি নীতি চালু করে। এর আওতায় বিদেশ থেকে জমা দেওয়া আবেদনের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরতদের করা পারিবারিক ভিসার আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিদেশে অবস্থানরতদের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় আগে থেকেই বসবাসরত দক্ষ অভিবাসীদের স্থায়ী ভিসার আবেদনকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্য বাদে ২৪টি দেশের নাগরিকদের জন্য ‘ওয়ার্কিং হলিডে ভিসা’র আবেদন গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় নতুন আসা অভিবাসীদের সহায়তাকারী সংস্থা ‘সেটেলমেন্ট সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল’-এর ভায়োলেট রুমেলিওটিস বলেন, অভিবাসন বিষয়ক বিতর্কটি এখন দেশের জন্য যা সর্বোত্তম, তার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি রাজনীতির দ্বারা বেশি প্রভাবিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক ভিসার নিয়মে প্রস্তাবিত পরিবর্তনটি এর একটি বড় উদাহরণ। তার মতে, এর ফলে ভবিষ্যতে মেধাবীদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়ার জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension