যুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্পের ‘চাপ’ উপেক্ষা: যুক্তরাষ্ট্রে ৩ বছর পর বাড়ল সুদের হার

তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভবিষ্যতে এ হার আরও বাড়ানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা ও সুদের হার কমানোর আহ্বান সত্ত্বেও ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সুদের হার ৩.৫-৩.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৭৫-৪ শতাংশ করেছে।

ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি এবং এটি দীর্ঘ সময় ধরে রয়েছে বলেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি এটিকে একটি ‘সুচিন্তিত ও দায়িত্বশীল’ সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন।

ঘোষণার পর ট্রাম্প ওয়ার্শের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করলেও সুদের হারের সিদ্ধান্তের ওপর ভোট দেওয়া ফেড বোর্ডকে ‘বৈরী’ বলে আখ্যায়িত করেন।

উচ্চ সুদের হারের কারণে ঋণ, মর্টগেজ (বন্ধক) ও ক্রেডিট কার্ড নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য ঋণ গ্রহণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। তবে এতে সঞ্চয়ে ভালো মুনাফা আসতে পারে।

স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার এ সিদ্ধান্তের পর এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়ার্শ বলেন, ফেড নেতৃত্বের মধ্যে আশাবাদের মনোভাব থাকলেও মূল্যস্ফীতি এখনও একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

অন্যান্য অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো ফেডেরও লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ বা তার নিচে রাখা। ওয়ার্শ উল্লেখ করেন, মার্কিন মূল্যস্ফীতি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।

ক্রয়ক্ষমতা আমেরিকান ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর পাইকারি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হতে দেখেছেন তারা। এর ফলে অনেক পণ্য ও সেবার দামও বেড়ে গেছে।

ওয়ার্শ বলেন, ফেডারেল ব্যাংক তেলের দাম হোক বা মুদিদোকানের খাবারের দাম হোক—কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না ঠিকই, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিজুড়ে মূল্যবৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে কাজ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শ্রমবাজার ও বৃহত্তর অর্থনীতির শক্তির অর্থ হলো ফেড মূল্য স্থিতিশীল করার দিকে নজর রাখছে এবং নিম্ন মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্রতম লোকেরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন।

আমেরিকানদের ওপর উচ্চ সুদের হারের প্রভাব
কেভিন ওয়ার্শকে যখন চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তখন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা বলেছিলেন যে তিনি ট্রাম্পের ‘হাতের পুতুল’ হবেন। অনেক ফেড পর্যবেক্ষকও আশা করেছিলেন, সুদের হার কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের অনবরত দাবিগুলো পূরণ করবেন তিনি। এর আগে সুদের হার না কমানোর কারণে ট্রাম্প ওয়ার্শের পূর্বসূরি জেরোম পাওয়েলের কড়া সমালোচনা করেছিলেন।

গতকাল বুধবার ট্রাম্পের কাছে সুদের হার বৃদ্ধির কী বার্তা গেছে, সে সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ওয়ার্শ মৃদু হেসে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে আপনাদের জানানোর মতো আমার কাছে কিছু নেই।’

পরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কেভিনের (ওয়ার্শ) ওপর নির্ভর করছি, তবে আপনারা তো জানেনই যে তার একটি অত্যন্ত কঠোর বোর্ড রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সুদের হার অনেক বেশি। এগুলো উপযুক্ত নয়। আমি কেভিনকে বলেছিলাম, ‘আপনি বোর্ডের সাথেই ভোট দিতে পারেন, কারণ এতে কিছু যায় আসবে না।’ বোর্ডটি খুব বৈরী, তারা খুব বেশি রাজনৈতিক।’’

এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেডারেল ব্যাংকের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমেরিকার জন্য সুদের হার কমান, এবং তা দ্রুত!’

ক্যাপিটল হিলের ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, এই হার বৃদ্ধির ফলে ঋণ আরও ব্যয়বহুল হবে এবং ফলস্বরূপ আরও বেশি সংখ্যক আমেরিকান ঋণের ফাঁদে পড়বেন।

ফেডের এ হার বৃদ্ধি হলো ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সুদের হার কমানোর পর যেকোনো দিকে হারের প্রথম পরিবর্তন। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জুলাই মাসে হার বাড়ানো হয়েছিল।

এ বৃদ্ধি বাড়ি ক্রেতাদের জন্য মর্টগেজের হার বাড়িয়ে দিতে পারে এবং এর ফলে আমেরিকানদের অন্যান্য ধরনের ঋণের ওপরও বেশি অর্থ প্রদান করতে হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ব্যাংক জেপি মরগান, কিকর্প ও বিএনওয়াই বুধবার তাদের প্রাইম লেন্ডিং রেট ৬.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে, যা ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণের হারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

গত এক বছরে মর্টগেজ খরচ বেড়েছে, তবে এটি ২০২৩ সালে দেখা সর্বোচ্চ সীমার নিচেই রয়েছে। ফ্রেডি ম্যাকের পরিসংখ্যান অনুসারে, ৩০ বছর মেয়াদি ফিক্সড ডিলের গড় হার হলো ৬.৭৬ শতাংশ, যেখানে ১৫ বছর মেয়াদি ডিলের হার ৬.০৯ শতাংশ।

অনেক মার্কিন বাড়ির মালিকের ৩০ বছর ও ১৫ বছরের ফিক্সড রেটের মর্টগেজ রয়েছে। সুদের হারের এই পরিবর্তন তাদের মাসিক কিস্তির ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে উচ্চ সুদের হার নতুন মর্টগেজ বা পুনঃঅর্থায়ন করতে চাওয়া ব্যক্তিদের প্রভাবিত করতে পারে।

ফেডের সুদের হার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সে বিষয়ে ওয়ার্শ তার নিজস্ব মতামত দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তার সহকর্মী নীতিনির্ধারকদের বেশির ভাগই জানিয়েছেন, তারা বিশ্বাস করেন চলতি বছরের শেষের আগেই সুদের হার আবার বাড়িয়ে ৪ থেকে ৪.২৫ শতাংশের মধ্যে করা হবে।

একাধিক সদস্য আরও বলেছেন যে, ২০২৮ ও ২০২৯ সালে হার কমানো শুরু হওয়ার আগে আগামী বছর সুদের হার আরও বেড়ে ৪.২৫ থেকে ৪.৫ শতাংশ হতে পারে।

পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি হ্রাস পাবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত পরিমাপক মূল্যস্ফীতি ২০২৯ সালের মধ্যে ফেডের লক্ষ্যমাত্রায় ধারাবাহিকভাবে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধের পর থেকে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মুখে পড়া মার্কিন ফেড একা নয়, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও গত সপ্তাহে সুদের হার বাড়িয়েছে এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড আজ বৃহস্পতিবার তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension