বাংলাদেশ

এআই নিয়ন্ত্রণে কেন এত টানাটানি, পক্ষে-বিপক্ষে কারা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কতটা দ্রুত হওয়া উচিত এবং তা মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একপক্ষে রয়েছেন এআই খাতের শীর্ষ গবেষক, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও রাজনীতিকরা, যারা নিরাপত্তার স্বার্থে এআই উন্নয়নের গতি কমানো ও কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছেন।

অন্যপক্ষে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, শীর্ষ চিপ নির্মাতা সংস্থা এনভিডিয়ার সিইও এবং তাদের মিত্ররা, যাদের মতে গতি কমানোর প্রচেষ্টা হলো একধরনের ‘ধাপ্পাবাজি’, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় চীনকে এগিয়ে দেবে।
এই বিতর্কের মূল সূত্রপাত এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর সাবেক এক গবেষকের চাকরি ছাড়া এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ডারিও অ্যামোডেই-এর দেওয়া এক সতর্কবার্তাকে কেন্দ্র করে। অ্যামোডেই জানান, এআই মডেল উন্নয়নের গতি এখন এতটাই অবিশ্বাস্যভাবে বাড়ছে যে প্রযুক্তিটি মানুষের বোঝার ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা একে বলছেন ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’—অর্থাৎ মানুষ ছাড়া এআই নিজেই নিজেকে আরো উন্নত ও বুদ্ধিমান করে তুলছে।

অ্যামোডেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মানুষের চেয়েও শক্তিশালী এআই তৈরি হলে তা বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরি, বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানো কিংবা নিজস্ব লক্ষ্য পূরণে মানুষের নির্দেশ অমান্য করার মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সাধারণত ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এই ইস্যুতে অ্যানথ্রোপিক প্রধানের সুরেই সুর মিলিয়েছেন ‘ওপেনএআই’-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং ‘টেসলা’ ও ‘এক্স’-এর প্রধান ইলন মাস্ক। অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক বিবিসি-কে বলেন, আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা দরকার যেখানে প্রয়োজন হলে গতি কমানো বা থামানোর উপায় থাকে। বর্তমানে এআই শিল্পের কাছে কেবল অ্যাক্সিলারেটর আছে, কোনো ব্রেক নেই।

এই সুরের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যথাযথভাবে পরিচালনা না করলে এআই মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এবং এ জন্য দ্রুত কার্যকর নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানান।

তবে এআই-এর গতি কমানোর এই প্রস্তাবকে সহজভাবে নিচ্ছেন না সিলিকন ভ্যালি ও হোয়াইট হাউসের অনেক কর্মকর্তা। তাদের দাবি, অ্যানথ্রোপিক সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির ভয় দেখিয়ে ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছে, যাতে নিরাপত্তার অজুহাতে তারা ব্যাবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের গতি থামিয়ে দিতে পারে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং এনভিডিয়া সিইও জেনসেন হুয়াং এআইয়ের ওপর কোনো নতুন বিধিবিধান চাপানোর সরাসরি বিরোধিতা করেছেন।

ট্রাম্পের মতে, এআই-এর গতি কমালে বা নতুন ডেটা সেন্টার গঠনে বাধা দিলে চীন সেই সুযোগে এই প্রযুক্তির দৌড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে দেবে। এনভিডিয়ার সিইও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন কোনো আইনের প্রয়োজন নেই, বরং কম্পানিগুলোর আরো দ্রুত গতিতে কাজ করা উচিত।
কড়া সমালোচনা সত্ত্বেও অ্যানথ্রোপিকের ‘মাইথোস’ নামক নতুন এআই মডেলের চরম শক্তির কথা স্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস। সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা ভেবে এই মডেলটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না রেখে কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

চীনকে নিয়ে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ভয় থাকলেও, ট্রাম্প সম্প্রতি বেইজিং সফরে এআই নিরাপত্তা বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তিনি একটি নতুন নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যার অধীনে মার্কিন কম্পানিগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল বাজারে ছাড়ার আগে সরকারকে অন্তত ৩০ দিন পর্যালোচনার সুযোগ দিতে হবে।

ওয়াশিংটন ও সিলিকন ভ্যালির এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ও নীতিগত বিরোধ নিরসনে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আগামী সপ্তাহেই হোয়াইট হাউসে একটি বিশেষ বৈঠক ডাকতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension