আন্তর্জাতিকভারত

ভারতীয়দের ‘স্বপ্নের গন্তব্য’ কানাডার ভিসা আবেদন কমেছে ৮০ শতাংশ!

ভারতীয়দের একসময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য কানাডায় যাওয়ার হার ব্যাপকভাবে কমেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে দাবি করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির রাজধানী দিল্লির একটি বিদেশে পড়াশোনা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় এখনো আছে।

তবে একসময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য কানাডার জন্য তেমন কেউই আসেননি।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শোভিত আনন্দ জানান, ‘২০২৩ সাল পর্যন্ত আমাদের বেশির ভাগ আবেদনই ছিল কানাডার জন্য। কিন্তু এখন তা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন আর কানাডায় আবেদন করতে আগ্রহী নয়।

ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও অনেক বেশি।’
কানাডার অডিটর জেনারেলের বরাতে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটিতে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয়দের হার নেমে এসেছে মাত্র ৮.১ শতাংশে, যেখানে ২০২৩ সালে এটি ছিল ৫১.৬ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বড় পতনের পেছনে রয়েছে ভিসা ও অভিবাসননীতির কঠোরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ২০২৩ সালের কূটনৈতিক সংকট, যা দুই দেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল (যদিও বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে)।

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারগুলোর কাছে কানাডা ছিল একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।

বিশেষ করে বেসরকারি কলেজগুলোতে তুলনামূলক সহজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষে কাজ পাওয়া এবং কয়েক বছরের মধ্যে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
সাধারণত দুই থেকে তিন বছরের কোর্স শেষে চাকরি নিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করা যেত। তবে এই পথ এখন আর আগের মতো সহজ নয়।

২০২৪ সালের শুরুতে কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দুই বছরের সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এতে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার স্টাডি পারমিটে সীমা নির্ধারণ করা হয় (স্নাতকোত্তর কোর্স এতে অন্তর্ভুক্ত নয়)।

এ ছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়াও বড় একটি কারণ। দেশটির বড় শহরগুলোতে বাড়িভাড়া বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, একই সঙ্গে আর্থিক যোগ্যতার শর্তও কঠোর করা হয়েছে।

বিশেষ করে গ্যারান্টিড ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের (জিআইসি) পরিমাণ ১০ হাজার কানাডিয়ান ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলারের বেশি করা হয়েছে, যা অনেক পরিবারের জন্য জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরামর্শক সুশীল সুখওয়ানি বলেন, ‘এত বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন। তার ওপর ভিসা না পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় অনেকেই আবেদন করতে দ্বিধা করছেন।’

তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় স্টাডি পারমিট প্রত্যাখ্যানের হার ২০২৩ সালে ৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে গেছে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের মধ্যে।

এ ছাড়া দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য চালু হওয়া ‘স্টুডেন্ট ডাইরেক্ট স্ট্রিম (এসডিএস)’ নামের ব্যবস্থাটি বাতিল করাও প্রভাব ফেলেছে। এই পদ্ধতিতে ভিসা অনুমোদনের হার ২০২২ সালের ৬১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৯৮ শতাংশে উঠলেও জাল আবেদন, ক্লাসে অনুপস্থিতি এবং আশ্রয় আবেদন বৃদ্ধির অভিযোগ ওঠায় এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চাকরির সুযোগ কমে যাওয়াও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বেসরকারি কলেজ দ্রুত সম্প্রসারণ করেছে, তবে শিক্ষার মান ও চাকরির সুযোগ সে অনুযায়ী বাড়েনি।

ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ খরচের বিনিময়ে পড়াশোনা শেষ করেও প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছেন না।

দিল্লির এক শিক্ষার্থীর উদাহরণ দিয়ে শোভিত আনন্দ বলেন, ‘দুই বছর আগে কানাডায় যাওয়া এক শিক্ষার্থী কোর্স শেষ করে স্থায়ী কাজ খুঁজে পায়নি। খণ্ডকালীন কাজ করে চলতে হচ্ছিল তাকে। শেষ পর্যন্ত সে দেশে ফিরে এসেছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ তারা মূলত উচ্চমানের শিক্ষার জন্য আবেদন করেন, অভিবাসনের উদ্দেশ্যে নয়।

তবে সামগ্রিকভাবে কানাডার প্রতি আকর্ষণ কিছুটা কমে গেছে। যদিও দুই দেশের সম্পর্ক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে। তার পরও অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কানাডায় পড়তে যাওয়া এখন আর সহজ সিদ্ধান্ত নয়।

দিল্লির শিক্ষার্থী তনিষ্ক খুরানা বলেন, ‘ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার এবং ভর্তি সীমাবদ্ধতার কথা শুনে আমি নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছি।’

তবে পারিবারিক কারণে এখনো কানাডায় পড়ার পরিকল্পনা ছাড়েননি বলে জানান তিনি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension