
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বিষহ ৯ বছর
তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবজাতি এর চেয়েও ভয়াবহ অনেক সময় পার করেছে। কখনো মহামারি, কখনো যুদ্ধ, কখনো দুর্ভিক্ষ, আবার কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরো সমাজকে বিপর্যস্ত করেছে। ইতিহাসের এমন কিছু বছর রয়েছে, যখন মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রায় থেমে গিয়েছিল।
.jpg)
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ মাইকেল ম্যাককরমিক ৫৩৬ সালকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বছরগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এটি মানুষের জন্য বেঁচে থাকার দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ বছরও হতে পারে। সে সময় ইউরোপের বড় অংশ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার কিছু এলাকায় অস্বাভাবিক ঘন কুয়াশা ও অন্ধকার নেমে আসে।
২. ১৩৪৮ : কালো মৃত্যু
.jpg)
১৩৪৮ সাল ছিল ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া ‘কালো মৃত্যু’ বা ব্ল্যাক ডেথ মহামারির সবচেয়ে ভয়াবহ সময়গুলোর একটি। এই মহামারি ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সালের মধ্যে ইউরোপের বিশাল অংশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকাতেও এর প্রভাব পড়ে। ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হয়। সাধারণত ইঁদুরের শরীরে থাকা মাছির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত। এই মহামারিতে ইউরোপে আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি মানুষ মারা যায়। তখন ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই রোগে মারা গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। রোগটির প্রধান লক্ষণের মধ্যে ছিল জ্বর, কাঁপুনি ও শরীরের লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া। গুরুতর অবস্থায় ত্বক কালো হয়ে যেতে পারত এবং শরীরের বিভিন্ন টিস্যু নষ্ট হতে শুরু করত। ১৩৪৮ সালে রোগটি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল খুবই সীমিত। রোগের কারণ সম্পর্কেও মানুষের পরিষ্কার ধারণা ছিল না। ফলে আতঙ্কের পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে।
.jpg)
১৮১৫ সালের এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ার তাম্বোরা আগ্নেয়গিরিতে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত হয়। এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হিসেবে পরিচিত। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বিপুল পরিমাণ ছাই ও গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়াতেও এর প্রভাব পড়ে। এর পরের বছর, ১৮১৬ সালে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক এলাকায় অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা ও বৃষ্টির আবহাওয়া দেখা দেয়। গ্রীষ্মকালেও অনেক জায়গায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম ছিল। এ কারণে ১৮১৬ সাল পরিচিত হয়ে ওঠে ‘গ্রীষ্মহীন বছর’ নামে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ও বৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য সংকট তৈরি হয়। কোথাও কোথাও খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং মানুষ বিক্ষোভ ও দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে। বন্যা ও খারাপ আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে। কৃষিনির্ভর সমাজগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪. ১৯১৮ : স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি
.jpg)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়ই বিশ্ব আরেকটি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। ১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে শুরু হয় স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে রোগটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এর বিভিন্ন ঢেউ চলতে থাকে। ধারণা করা হয়, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষ এই মহামারিতে মারা যায়। অনেক দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীর চাপ সামলাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। তখন দেশটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে তখন বিশ্বের অনেক দেশই আগে থেকেই দুর্বল ছিল। যুদ্ধের কারণে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। মহামারির প্রভাব ছিল এতটাই বড় যে মানুষের গড় আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
.jpg)
১৯২৯ সাল বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামে। এর পর শুরু হয় মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন। অক্টোবরে ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারবাজারে ব্যাপক পতন হয়। অনেক বিনিয়োগকারী বিপুল অর্থ হারান। এরপর সংকট ধীরে ধীরে ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে দ্রুত বাড়তে থাকে বেকারত্ব। লাখ লাখ মানুষ চাকরি ও নিয়মিত আয় হারান। অনেক পরিবার খাবার ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও সমস্যায় পড়ে। শেয়ারবাজারের এই সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও পড়ে।
৬. ১৯৪৫ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছর
.jpg)
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ হয়। কিন্তু যুদ্ধের শেষ বছরটিও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ মারা যায়। ১৯৪৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং আরো বহু মানুষ আহত হন। পরে পারমাণবিক বিকিরণের কারণেও অনেকে মারা যান। এর আগে টোকিওসহ জাপানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়। টোকিওতে আগুনবোমা হামলায় কয়েক দশক হাজার থেকে এক লাখের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে ইউরোপে নাৎসি জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত হয়ে আসছিল। যুদ্ধের শেষ দিকে নাৎসিরা হলোকাস্টের প্রমাণ ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়। হলোকাস্টে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি এবং আরও লাখ লাখ মানুষ নিহত হন। ১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। পুরো যুদ্ধে মৃত মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। মোট মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ৭ কোটি থেকে ৮ কোটি ৫০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
.jpg)
১৯৬৭ সাল যুক্তরাষ্ট্রে ‘ভালোবাসার গ্রীষ্ম’ নামে পরিচিত হলেও ১৯৬৮ সাল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রবার্ট এফ. কেনেডি নিহত হন। এই দুই হত্যাকাণ্ড দেশটির মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভ তৈরি করে। একই সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধ আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। টেট আক্রমণের মাধ্যমে যুদ্ধের ব্যাপকতা ও ধ্বংসযজ্ঞ আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপেও ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়। প্যারিস, শিকাগোসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফলে ১৯৬৮ সাল বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
.jpg)
২০০১ সালের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা। সেদিন আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে। দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত করে। আরেকটি বিমান আঘাত করে ওয়াশিংটনের কাছে পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। এই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তানীতি ও বৈদেশিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। শুরু হয় সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এ ছাড়া ওই বছরই প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটভিত্তিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন ঘটে। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ে।
.jpg)
২০২০ সাল বিশ্বের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন বছর। করোনাভাইরাসের নতুন ধরন দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মার্চের মধ্যে বিশ্বের বহু দেশ লকডাউন ও নানা ধরনের বিধি-নিষেধ জারি করে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশ বন্ধ হয়ে যায়। কোটি কোটি মানুষ ঘরে থাকতে বাধ্য হন। অনেকেই চাকরি হারান বা আয় কমে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। কোভিড-১৯-এ বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যান। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। তবে ২০২০ সালের সংকট শুধু করোনাভাইরাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার পর দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। বর্ণবৈষম্য ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এ বছর অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ দাবানলও দেখা দেয়। এতে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২০ সাল তাই একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশ—সব দিক থেকেই বড় সংকটের বছর হয়ে ওঠে।
৫৩৬ খ্রিস্টাব্দের অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা থেকে শুরু করে কালো মৃত্যু, গ্রীষ্মহীন বছর, বিশ্বযুদ্ধ, মহামারি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং ২০২০ সালের কভিড সংকট—প্রতিটি বছরই দেখিয়েছে, মানুষের স্বাভাবিক জীবন কত সহজে বদলে যেতে পারে। কখনো একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া বদলে দিয়েছে। কখনো একটি রোগ কয়েক কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। আবার কখনো যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট পুরো সমাজকে বিপর্যস্ত করেছে। তবে এসব সংকটের মধ্য দিয়েই মানুষ নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কঠিন সময় পেরিয়ে সমাজ আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। ইতিহাসের এসব বছর তাই শুধু দুর্ভোগের গল্প নয়; একই সঙ্গে মানুষের টিকে থাকার ক্ষমতারও প্রমাণ।



