ব্যক্তিত্বযুক্তরাষ্ট্র

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জীবন ও রেখে যাওয়া প্রেরণা

যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য অহিংস আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ।

যুক্তরাষ্ট্রে জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সোমবার মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস উপলক্ষে ছুটি থাকে। এ দিনটিতে কিংয়ের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। সেইসঙ্গে নাগরিকদের অনুপ্রাণিত করা হয় নিজ নিজ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করতে।

অভিযাত্রার শুরুটা যেভাবে
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের পূর্বপুরুষদের অনেকেই ছিলেন ব্যাপটিস্ট যাজক। ১৯২৯ সালের ১৫ জানুয়ারি আটলান্টায় জন্ম কিং জুনিয়রের। বেড়ে ওঠেন এ শহরেই। ওই সময় জিম ক্রো আইনের বদৌলতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য বিচ্ছিন্নকরণ (সেগ্রিগেশন) ও বৈষম্য পরিণত হয়েছিল নিত্যদিনের বাস্তবতায়।

কিং আটলান্টার মোরহাউস কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে তিনি ধর্মকে সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী অনুঘটক হিসাবে দেখতে শেখেন। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব থিওলজি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়ার পর দক্ষিণে ফিরে যান তিনি। যাজক হিসাবে যোগ দেন অ্যালাবামার মন্টগোমারির ডেক্সটার অ্যাভিনিউ ব্যাপটিস্ট চার্চে।

কিং জুনিয়রের আটলান্টার জন্মস্থানটি এখন জাতীয় উদ্যান সার্ভিসের নিবন্ধিত জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান।

১৯৫০ এর দশকে নাগরিক অধিকারের সংগ্রাম
কিং জুনিয়র মন্টগোমারি বাস বয়কট কর্মসূচির আয়োজনে সহায়তা করেছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ সেলাইকর্মী রোসা পার্ক এক শ্বেতাঙ্গ যাত্রীর জন্য বাসের সিট ছেড়ে দিতে অস্বীকার করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে ঘটনা থেকেই এক বছরব্যাপী ওই আন্দোলন কর্মসূচির শুরু। ১৯৫৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট অ্যালাবামার বাসের বিচ্ছিন্নকরণ আইন বাতিল করার পর কিং কয়েকজনের সঙ্গে মিলে সাউদার্ন ক্রিস্টিয়ান লিডারশিপ কনফারেন্স প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু হয় দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে নাগরিক অধিকারের জন্য অহিংস আন্দোলনের প্রচারণা। ভারতের মহাত্মা গান্ধীর শিক্ষায় প্রভাবিত হয়েছিলেন কিং। ১৯৫৯ সালে তিনি ভারত সফর করেন।

১৯৬০ এর দশকের এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব
কিং একসময় আটলান্টার এবেনিজার ব্যাপটিস্ট চার্চের সহ-যাজক হিসাবে বাবার সঙ্গে যোগ দেন। বর্ণগত বিচ্ছিন্নকরণ ও আইনি বৈষম্যের অবসান ঘটাতে নিজের বাগ্মিতার দক্ষতা কাজে লাগাতে থাকেন তিনি। ১৯৬০ এর দশক জুড়ে অ্যালাবামা, ফ্লোরিডা এবং জর্জিয়াতে অহিংস প্রতিবাদের সময় বারবার গ্রেপ্তার হন কিং জুনিয়র। এইরকম একটি গ্রেফতারের ঘটনার পরে বার্মিংহাম সিটি জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি তুলে ধরে এক চিঠি লেখেন। সেটা ১৯৬৩ সালের ঘটনা। সে বছরেরই আগস্টে তিনি ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে সমবেত দুইলাখের বেশি মানুষের উদ্দেশে তাঁর বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ বক্তৃতা দেন।

১৯৬৫ সালের ৭ই মার্চ কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকারের দাবিতে মিছিলকারীরা অ্যালাবামার সেলমার এডমন্ড পেটাস ব্রিজ পার হওয়ার সময় পুলিশ ও কিছু বেসামরিক লোক তাদের বেদম পিটুনি দেয়। দিনটি পরিচিতি পায় ‘রক্তাক্ত রবিবার’ হিসাবে। সেদিন সহিংসতার কারণে মিছিলকারীরা ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তবে কিং এর জবাবে ভোটের অধিকারের দাবিতে আরও বড় একটি মিছিলের (ছবিতে) ডাক দেন। ওই মিছিল ছিল সেলমা থেকে মন্টগোমারি পর্যন্ত ৮৭ কিলোমিটার জুড়ে।

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের জয়
১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন নাগরিক অধিকার আইনে স্বাক্ষর করেন, যা চাকরি এবং গণ আবাসন ব্যবস্থাসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। কিং জুনিয়র আইনটিতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর করার (ছবিতে) অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষরতার পরীক্ষার মতো বৈষম্যমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে যাতে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা না যায় সেজন্য আইন প্রণয়নের জন্য তিনি আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৫ সালে লিন্ডন জনসন ভোটাধিকার আইনে স্বাক্ষর করেন। ১৯৬৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান কিং জুনিয়র।

হত্যাকাণ্ড ও তার প্রভাব
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল টেনেসির মেমফিস শহরে তার হোটেল কক্ষের ব্যালকনিতে দাঁড়ানো অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে হাজারো শোকাকুল মানুষ যোগ দেন।আটলান্টার সড়ক দিয়ে ঘোড়ায় টানা বিশেষ শকটে সম্মানের সঙ্গে তার কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়।

মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘আশার বাণী’ (এ টেস্টামেন্ট অব হোপ) নামে একটি প্রবন্ধে কিং কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের অহিংস আন্দোলনের প্রতি তাদের অঙ্গীকার অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।তবে সতর্ক করে দিয়ে এ-ও বলেন, সমাজকাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

কিংয়ের উত্তরাধিকার: অহিংস প্রতিবাদ
১৯৫৯ সালের ভারত সফরকালে রেডিওতে দেওয়া ভাষণে কিং বলেছিলেন: ‘আজ আর আমাদের সামনে সহিংসতা ও অহিংসার মধ্যে কোন একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি হবে হয় অহিংসতা, নয় অস্তিত্বহীনতা।’

কিংয়ের দর্শনের ওপর ভারতে ব্রিটিশ শাসন অবসানের জন্য মহাত্মা গান্ধীর চালানো অহিংস আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল। কিংও বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীকে অহিংস উপায়ে তাদের সমাজ পরিবর্তন আনার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল সোভিয়েত দখলদারত্বের অবসান ঘটাতে পোল্যান্ডের সলিডারিটি আন্দোলন থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ অবসানের জন্য নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রাম।

কিংয়ের উত্তরাধিকার: সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করা
ওয়াশিংটনে ১৯৬৩ সালের মিছিলের সময় কিং ঘোষণা করেছিলেন, ‘মানুষকে তাদের ত্বকের রঙ দিয়ে নয়, বরং চরিত্রের মান দিয়ে বিচার করা উচিত।’

আটলান্টার কিং সেন্টার একটি মুক্ত ও সমতায় ভরা বিশ্বেরব্যাপারে কিংয়ের স্বপ্নের এক জীবন্ত স্মারক। সবার জন্য সুযোগকে বিস্তৃত করা, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ও সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটাতে নিবেদিত এ প্রতিষ্ঠানটি।

কিংয়ের উত্তরাধিকার: সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য প্রচেষ্টা চালানো
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন ইনস্টিটিউটে রয়েছে ‘কিং পেপারস প্রজেক্ট’। এটি হচ্ছে কিংয়ের সমস্ত বক্তৃতা, চিঠিপত্র ও অন্যান্য লেখার বিস্তৃত সংগ্রহ। এই ইনস্টিটিউটটি লিবারেশন কারিকুলাম ইনিশিয়েটিভ এবং গান্ধী-কিং কমিউনিটির সঙ্গেও যুক্ত। দুটি উদ্যোগই বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে নিয়োজিত সামাজিক আন্দোলন কর্মীদের যুক্ত করতে কিংয়ের জীবনকাহিনি ও ধারণাকে কাজে লাগায়।

কিংয়ের উত্তরাধিকার: অন্যের সেবা
যুক্তরাষ্ট্রে মার্টিন লুথার কিং দিবসকে জাতীয় সেবার একটি দিবস মনোনীত করা হয়েছে। অন্যের জীবনে উন্নতি আনার বিষয়ে কিংয়ের প্রতিশ্রুতিকে সম্মান জানাতে আমেরিকানদের এদিন’ছুটির দিন নয় বরং একটি কাজের দিন’ হিসেবে উদযাপন করার আহ্বান জানানো হয়। আমাদের বিশ্বের সামনে উঠে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছাসেবায় উৎসাহ যোগান।

স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা
কিং জুনিয়রের স্মরণে লিংকন মেমোরিয়ালের কাছে একটি জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। কিং এখানেই তাঁর বিখ্যাত “আই হ্যাভ এ ড্রিম’ ভাষণটি দিয়েছিলেন। স্মৃতিসৌধটি দর্শনার্থীদের কিংয়ের জীবন ও উত্তরাধিকারের বিষয়ে জানার আমন্ত্রণ জানায়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension