
যাঁরা আর ঘরে ফেরেননি
৯/১১-এর ২৫ বছর পরও অমলিন ছয় বাংলাদেশি জীবনের স্মৃতি
নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারানো বাংলাদেশি-আমেরিকানদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ; শাহ্ গ্রুপের বিশেষ শোক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
শাহ্ জে. চৌধুরী, নিউইয়র্ক:
২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু সকাল কখনো পুরোনো হয় না।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই সকাল নিউইয়র্কের ইতিহাসে যেমন এক গভীর ক্ষতের নাম, তেমনি বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজের কাছেও এটি কয়েকটি প্রিয় মুখ হারানোর বেদনার দিন। তাঁরা এসেছিলেন স্বপ্ন নিয়ে, কাজ করতে গিয়েছিলেন প্রতিদিনের মতো—কিন্তু আর কোনোদিন ঘরে ফিরতে পারেননি।
নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সেদিন প্রাণ হারানো হাজারো মানুষের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েকজন অভিবাসী। তাঁদের জীবন ছিল ভিন্ন ভিন্ন গল্পে ভরা—কেউ ছিলেন পেশাজীবী, কেউ প্রযুক্তিকর্মী, কেউ রেস্তোরাঁকর্মী। কিন্তু তাঁদের সবার মধ্যে ছিল একটি অভিন্ন স্বপ্ন—পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করা।
একটি ছবির ভেতর ফিরে আসে একটি জীবন
এই ২৫ বছর পূর্তিতে বিশেষভাবে স্মরণ করা হচ্ছে মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী, যাঁকে ঘনিষ্ঠজনেরা ‘সামু’ নামে চিনতেন।
মৃত্যুর আগে তোলা তাঁর একটি ছবি আজ যেন সময়ের দরজা খুলে দেয়। ছবির মানুষটি জানতেন না, তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে এমন একটি সকাল, যার পর আর কোনোদিন তিনি প্রিয়জনদের কাছে ফিরবেন না।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে সালাহউদ্দিন চৌধুরী নিউইয়র্কে নিজের জীবন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি Windows on the World-এ কর্মরত ছিলেন। তাঁর ছিল পরিবার, সন্তান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য স্বপ্ন। ৯/১১-এর হামলা সেই স্বপ্নের পথ থামিয়ে দেয়।
তাঁর পরিবারের জন্য সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা ছিল—একদিকে বাবাকে হারানোর শোক, অন্যদিকে সেই সময়েই পৃথিবীতে আসা নতুন সন্তানের বাবাহীন হয়ে বেড়ে ওঠা।
একটি জীবন শেষ হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বর। কিন্তু একটি পরিবারের অপেক্ষা, শোক ও স্মৃতি শেষ হয়নি।
শুধু ছয়টি নাম নয়—ছয়টি পরিবার, ছয়টি পৃথিবী
৯/১১-তে নিহত বাংলাদেশি-আমেরিকানদের স্মরণে উঠে আসে শাকিলা ইয়াসমিন, নূরুল হক মিয়া, মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহজাহান, শাব্বির আহমেদ এবং আবুল কে. চৌধুরী-র নাম।
তাঁদের প্রত্যেকের জীবন ছিল আলাদা। কারও ছিল স্বামী বা স্ত্রী, কারও সন্তান, কারও বাবা-মা, কারও ছিল নতুন জীবন গড়ার সংগ্রাম।
শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল হক মিয়া ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই দম্পতি সেদিন একসঙ্গে হারিয়ে যান। তাঁদের পরিবারের কাছে ৯/১১ তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়—এটি একই দিনে দুটি প্রিয় মানুষকে হারানোর আজীবন বেদনা।
মোহাম্মদ শাহজাহান ছিলেন কম্পিউটার প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মজীবী মানুষ। শাব্বির আহমেদ দীর্ঘদিন Windows on the World-এ কাজ করেছেন। আর আবুল কে. চৌধুরী কর্মরত ছিলেন Cantor Fitzgerald-এ।
তাঁরা কেউই ইতিহাসের অংশ হওয়ার জন্য সেদিন কাজে যাননি। তাঁরা গিয়েছিলেন তাঁদের প্রতিদিনের জীবনের মতোই—কাজ করতে, জীবিকা নির্বাহ করতে, পরিবারকে এগিয়ে নিতে।
কিন্তু ইতিহাস তাঁদের জীবনকে অন্য অর্থে অমর করে দেয়।
অভিবাসী জীবনের অসমাপ্ত গল্প
বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে আসা প্রতিটি অভিবাসীর সঙ্গে থাকে একটি গল্প—ত্যাগের, পরিশ্রমের, স্বপ্নের।
৯/১১-তে নিহত বাংলাদেশিরাও সেই অভিবাসী ইতিহাসের অংশ।
তাঁরা নিউইয়র্কের কর্মজীবনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। এই শহরের অর্থনীতি, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে তাঁদের শ্রমেরও ছিল অবদান।
তাঁদের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অভিবাসীরা শুধু একটি শহরে বসবাস করেন না; তাঁরা সেই শহরের ইতিহাসও নির্মাণ করেন।
২৫ বছর পরও স্মৃতি অমলিন
আজ গ্রাউন্ড জিরোতে নতুন স্থাপত্য দাঁড়িয়ে আছে। জলধারার চারপাশে খোদাই করা আছে নিহতদের নাম। মানুষ সেখানে ফুল রেখে যায়, নীরবে দাঁড়ায়, প্রার্থনা করে।
সময় বদলেছে। নিউইয়র্ক বদলেছে। নতুন প্রজন্ম এসেছে।
কিন্তু নামগুলো রয়ে গেছে।
কারণ একটি মানুষকে হারানো মানে শুধু একজনকে হারানো নয়—হারিয়ে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যতের একটি অংশ, একটি শিশুর শৈশবের একটি অংশ, একজন স্বামী বা স্ত্রীর জীবনের একটি অংশ, একজন বাবা-মায়ের হৃদয়ের একটি অংশ।
তাই ২৫ বছর পরও তাঁদের স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
শাহ্ গ্রুপের বিশেষ শোক ও শ্রদ্ধা
শাহ্ গ্রুপ গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলায় নিহত সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
বিশেষভাবে স্মরণ করছে সেই বাংলাদেশি-আমেরিকানদের, যারা স্বপ্ন নিয়ে নিউইয়র্কে এসেছিলেন, পরিবার ও ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করেছিলেন, কিন্তু সেদিন আর ঘরে ফিরতে পারেননি।
শাহ্ গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়:
“২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ৯/১১-এর ক্ষত আমাদের হৃদয়ে অমলিন। যারা সেদিন সকালে স্বাভাবিক দিনের মতো কর্মস্থলে গিয়েছিলেন, কিন্তু আর প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসতে পারেননি—তাঁদের স্মৃতি আমাদের কাছে শুধু ইতিহাস নয়; এটি মানবতার এক গভীর বেদনার অধ্যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশি-আমেরিকান যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। তাঁদের স্মৃতি, তাঁদের স্বপ্ন এবং তাঁদের জীবন আমাদের কাছে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
শাহ্ গ্রুপ একই সঙ্গে সন্ত্রাস, ঘৃণা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে মানবতা, শান্তি, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে।
তাঁদের আমরা ভুলিনি
২৫ বছর পরও প্রশ্নটি একই—
তাঁরা কোথায়?
উত্তরটি আমাদের স্মৃতিতে।
তাঁরা নেই তাঁদের ঘরে, নেই কর্মস্থলে, নেই প্রিয়জনের পাশে। কিন্তু তাঁরা আছেন তাঁদের পরিবারের স্মৃতিতে, নিউইয়র্কের ইতিহাসে এবং আমাদের সম্মিলিত হৃদয়ে।
একটি ভবন ধসে পড়তে পারে।
একটি শহর বদলে যেতে পারে।
সময় পেরিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু মানুষের স্মৃতি ধ্বংস হয় না।
আজ তাই তাঁদের উদ্দেশে আমাদের একটাই অঙ্গীকার—
**আমরা ভুলিনি।
আমরা ভুলব না।**
Never Forget.
September 11, 2001 — Forever in Our Hearts.
— শাহ্ গ্রুপের পক্ষ থেকে
গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা
ছবি












