
যুক্তরাষ্ট্রে যেতে কঠোর নিয়ম, আওতায় পড়বে ৪২ দেশের নাগরিক
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী বিদেশি পর্যটকদের জন্য নতুন একটি কঠোর নিয়ম কার্যকরের প্রস্তাব করেছে দেশটির শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা দপ্তর (সিবিপি)। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৪২টি দেশের নাগরিকদের বিগত ৫ বছরের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ইতিহাস জমা দিতে হতে পারে। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) ফেডারেল রেজিস্টার–এ প্রকাশিত এক নথিতে সিবিপি জানায়, ভবিষ্যতে ভ্রমণ অনুমোদনের আবেদনকারীদের কাছ থেকে ব্যাপক ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে। এর মধ্যে থাকবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংক্রান্ত তথ্য, গত ১০ বছরে ব্যবহৃত ই-মেইল ঠিকানা, এবং বাবা–মা, জীবনসঙ্গী, ভাই–বোন ও সন্তানদের নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান ও আবাসিক ঠিকানা।
এই পরিবর্তন মূলত ভিসা মওকুফ কর্মসূচি (ভিসা ওয়াবার প্রোগ্রাম)–ভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে এসব দেশের নাগরিকরা ইলেকট্রনিক সিস্টেম ফর ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইএসটিএ)–এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের অনুমতি পান।
বর্তমানে ইএসটিএ আবেদন করার সময় যেসব তথ্য দিতে হয়, তার মধ্যে রয়েছে:একটি ই-মেইল ঠিকানা,ফোন নম্বর,বাসার ঠিকানা,জরুরি যোগাযোগের তথ্য।এই অনুমোদনের মেয়াদ সাধারণত দুই বছর। আগেও চালু হয়েছে এমন নজরদারি। সংস্থাটির এই উদ্যোগ একেবারে নতুন নয়। মার্কিন সরকার এর আগেও এইচ-১বি ভিসা (দক্ষ কর্মী) এবং শিক্ষার্থী ও গবেষক ভিসার আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে সামাজিকমাধ্যম যাচাইয়ের নিয়ম চালু করেছে।
এ ছাড়া সরকার একটি নতুন ২৫০ ডলারের ‘ভিসা ইনটিগ্রিটি ফি’ চালুর পরিকল্পনাও করছে, যদিও ভিসা মওকুফ সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর নাগরিকরা এই ফি থেকে ছাড় পাবেন।
এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন শিল্প তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। গত নভেম্বর মাসে ২০টির বেশি ভ্রমণ ও পর্যটন সংস্থার একটি জোট যৌথ চিঠিতে এটির বিরোধিতা করে। তাদের আশঙ্কা, এই কঠোর নিয়মের কারণে বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্টে যোগ দিতে আগ্রহী কোটি কোটি মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হবেন।
এক শীর্ষ পর্যটন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সিবিপি এই পদক্ষেপ নিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি। তিনি এটিকে যাত্রী যাচাই–বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একটি ‘গুরুতর বাড়াবাড়ি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সিবিপি জানিয়েছে, প্রস্তাবটির বিষয়ে আগামী ৬০ দিন জনমতের জন্য সময় দেয়া হবে। ইমিগ্রেশন আইন সংস্থা ফ্রেগম্যান জানিয়েছে, প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যেই ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে। সংস্থাটির অংশীদার বো কুপার এই পরিবর্তনকে ‘প্যারাডাইম শিফট’ অর্থাৎ ধারণার আমূল পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, আগে সামাজিকমাধ্যম মূলত নির্দিষ্ট নিরাপত্তা তথ্য যাচাইয়ে ব্যবহার করা হতো, কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে অনলাইন আলোচনা ও মতামতও পর্যালোচনা করা হবে, এবং কর্মকর্তাদের নিজস্ব বিবেচনায় ভ্রমণ বাতিল করা হতে পারে।
ডিজিটাল অধিকার বিষয়ক সংগঠন ইলেক্ট্রনিক্স ফ্রন্টিয়া ফাউন্ডেশন-এর সিনিয়র আইনজীবী সোফিয়া কোপ বলেছেন, এই ধরনের বাধ্যতামূলক সামাজিক মাধ্যম নজরদারি ‘নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বড় ধরনের হুমকি।’ তার ভাষায়, এই পদ্ধতি সন্ত্রাসবাদ দমনে কার্যকরভাবে প্রমাণিত হয়নি, বরং এটি সাধারণ ভ্রমণকারীদের বাক্স্বাধীনতা স্তব্ধ করে দিচ্ছে এবং তাদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে।
চলতি বছরে মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে ৮৫ হাজারের বেশি অভিবাসীর ভিসা বাতিল করেছে। নতুন এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে ভ্রমণকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।এই বিষয়ে মন্তব্য চাইলেও সিবিপি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।



