বাংলাদেশশিক্ষা

‘যৌন হয়রানি নিয়ে অভিযোগ কমিটি থাকলেও বাস্তবায়ন নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে’

যৌন হয়রানি নিয়ে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি থাকলেও বাস্তবে অনেকেই এ বিষয়টি সম্পর্ক ওয়াকিবহাল না। কমিটির সদস্যরা নিজেরাই প্রশিক্ষিত নন। এছাড়া অনলাইন ও ডিজিটাল হয়রানির বিষয়টি নীতিমালায় না থাকায় এ বিষয়ে হওয়া সমস্যাগুলোর সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে মনিটরিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই স্কুল-কলেজগুলোতে।

মঙ্গলবার (১৩ ডিসেম্বর) রাজধানীর ডেইলি স্টার ভবনের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা: প্রয়োগ প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক সভায় এ কথা জানান আলোচকরা। ইউএন উইমেন এবং গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহযোগিতায় ‘কমব্যাটিং জেন্ডার বেসড ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ’ প্রজেক্টের আওতায় সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী সরকারি কলেজে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে ‘আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট’।

২০০৯ সালের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা নিয়ে রায় দেয় হাইকোর্ট। এতে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত পরিচালনা ও সুপারিশ করার জন্য একটি অভিযোগ গঠন কমিটি গঠন করতে হবে।

প্রকল্প প্রায় শেষের দিকে আসলেও এখনও সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ কমিটি নেই বলে জানান ‘আমরাই পারি’ জোটের প্রধান নির্বাহী জিন্নাত আরা হক।

তিনি বলেন, ‘পরিবারভিত্তিক প্রোগ্রাম বেশি বেশি হতে হবে। ছেলেমেয়ে আলাদা কিছু না। সব মেয়েকে যেমন নিজেকে মেয়ে না ভেবে মানুষ ভাবতে হবে তেমনি ছেলেদেরও নিজেদের ছেলে না ভেবে মানুষ ভাবতে হবে। মানুষ হওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।’

পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুজন কান্তি মালী বলেন, ‘আইনের প্রণয়ন ছাড়া কিছুই সম্ভব না। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে আইনের কঠোরতাও প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের খোলাধুলায় অংশগ্রহণ শুরু হলে আশপাশ থেকে নানানভাবে বুলিংয়ের স্বীকার হতো তারা। টি-শার্ট পরে মেয়েরা খেলছে সেই ধারণাটাই তারা নিতে পারে না। খেলায় জেতার আগে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে আমাদের মেয়েদের। এখন তারা চ্যাম্পিয়ন হয়। অভিযোগ কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তবায়ন আমাদের সমাজে কঠিন বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কালচারালি আমরা আগাতে পারছি না। বাচ্চাদের মাঝে দেশপ্রেম তৈরি হচ্ছে না। সেজন্য আমাদের দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা দায়ী।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জেবউননেছা বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা অনেক বেশি হয়। সেক্ষেত্রে আমরা এদিক থেকে পিছিয়ে আছি বলা যাবে না। তবে আমরা এখনও সব জায়গায় এই চর্চার প্রসার ঘটাতে পারিনি। ছেলেমেয়ে আলাদা কিছু না। তবে অভিযোগ কমিটিতে মেয়েদের হেনস্তার বিষয়টিই বারবার আসে। সেখান থেকে আমরা বেশি অভিযোগ পাই। ওরা এখন অনেক সচেতন হয়েছে। ওরা জানে অভিযোগ দেওয়া হলে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তা বাস্তবায়ন হবে। পুরুষ নির্যাতনকারী নয়, সমাজ পুরুষকে শিখিয়েছে নির্যাতন করা।’

সমাজকর্মী ও সংগঠক প্রফেসর মাহফুজা খানম বলেন, ‘মানুষের মানসিক পরিবর্তন নিম্নগামী হচ্ছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা দুইভাবে চলে। একটি সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা, অন্যটি গণতান্ত্রিক। সামন্ততান্ত্রিকতায় মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবা হলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় মানুষকে পণ্য হিসেবে ভাবা হয়।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা দেশকে, রাষ্ট্রকে কিছু দিয়ে যাও। পুর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠো। পৃথিবীকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখো।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আয়োজক সংগঠনের সভাপ্রধান শাহীন আনাম, সরকারি আজিজুল হক কলেজের প্রফেসর মো. শাহজাহান আলী, পটুয়াখালী সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সেলিনা আখতার, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আমেনা বেগম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যিালয়ের সেকশন অফিসার নুশরাত আমিনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension