
শাহজালাল বিমানবন্দর আগুন: দুর্ঘটনা নাকি ষড়যন্ত্র খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক তদন্ত হবে
অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ঘাটতির কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে লাগা আগুন পুরোপুরি নিভতে ২৭ ঘণ্টা লেগেছে। তবে এটি শুধু দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে ষড়যন্ত্র বা দুর্বলতা আছে– তা খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক তদন্ত করবে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, শাহজালাল বিমানবন্দরসহ সম্প্রতি দেশের নানা স্থানে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রোববার সচিবালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটির এ জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ একটি প্রিমিয়াম কেপিআইভুক্ত এলাকা। এরপরও কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে, কী দুর্বলতা ছিল– তা নিয়ে বৈঠকে পর্যালোচনা হয়েছে।
তবে বৈঠকে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও কিছু যন্ত্র দুর্বল ছিল। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ঘাটতির কারণে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে লাগা আগুন নিভতে ২৭ ঘণ্টা লেগেছে। দুর্বল বিষয়গুলোর বিষয়ে কী করণীয়, তা নির্ধারণ করতে তদন্ত কমিটিকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুর্বলতা ছিল প্রটেকশন ও ডিটেকশন পদ্ধতিতে
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এখানে যদি যে কোনো ধরনের ডিটেকশন সিস্টেম থাকত এবং এর সঙ্গে প্রটেকশন সিস্টেম থাকত, তাহলে হয়তো এতটা ক্ষতি ঘটত না। প্রিমিয়াম কেপিআইভুক্ত এলাকার সব স্থানে ফায়ার প্রটেকশন ও ডিটেকশন পদ্ধতি রাখা প্রয়োজন। এখানে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। এখন তদন্ত করে বের করতে হবে কখন, কীভাবে আগুনটা ধরেছিল।
যে কারণে আগুন নেভাতে বেশি সময় লেগেছে
শাহজালাল বিমানবন্দরের পোস্ট অফিস ও হ্যাঙ্গারের মাঝামাঝি স্থানে কার্গো ভিলেজ। আগুন লেগেছিল বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের পাশে কার্গো কমপ্লেক্স ভবনে। এই গেটকে হ্যাঙ্গার গেট বলা হয়। এখানে প্রতিটি জায়গা ভাগ করা ছিল। ভেতরে অনেক অংশ স্টিলের তৈরি। স্টিলের স্ট্রাকচার দিয়ে একতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত আছে। সে জন্য আগুন নেভাতে বেশি সময় লেগেছে। কার্গো ভিলেজের যে অংশে আগুন লেগেছে, সেখানে আমদানি করা পণ্য রাখা হয়।
বৈঠক শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, সঠিকভাবে এ ঘটনার কারণ জানতে আন্তর্জাতিক তদন্ত করা হবে। যেসব দেশের কর্মকর্তারা অগ্নিনির্বাপকের বিষয়ে অভিজ্ঞ, তাদের কমিটিতে যুক্ত করা হবে। কোন দেশের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত করা হতে পারে– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেসব দেশ থেকে দ্রুত রেসপন্স পাওয়া যাবে এবং আমাদেরও আগ্রহ রয়েছে, সেসব দেশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করা হবে।
এ বিষয়ে ঢাকার কুর্মিটোলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার নাহিদ মামুন বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এখনও কাজ করছে। তবে এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না।
বেশির ভাগ ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কার্যকর নেই
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নানা স্থানে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডসহ অন্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় প্রস্তুতি-সংক্রান্ত এ সভা আয়োজন করা হয়েছে। এর আগে গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর সভা হয়েছিল। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রায় প্রতিটি ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র আছে। কিন্তু বেশির ভাগ ভবনে যন্ত্রের কার্যকারিতা নেই। যন্ত্রের দুর্বলতার কারণে আগুন সহজে নেভানো যায় না।
সুপারিশ কার্যকর হয়নি
বৈঠকে গত ২৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে সচিবালয়ের আগুন লাগার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। তদন্ত কমিটি সচিবালয়ের অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য কয়েকটি সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে ছিল– প্রতিবছর মেইনটেন্যান্স অডিট করতে হবে। অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান ছাড়া ইন্টেরিয়রের কাজ করা যাবে না। ফায়ার প্রটেকশন ও ডিটেকশন পদ্ধতি সব ভবনে রাখতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি স্বাভাবিকভাবে ঢোকার ব্যবস্থা করতে হবে। সংযোগ করিডোরগুলো ভেঙে উঁচু করতে বলা হয়। তবে বেশির ভাগ সুপারিশ এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।
ত্রাণ উপদেষ্টার ব্রিফিং
বৈঠক শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম সাংবাদিকদের বলেন, স্বরাষ্ট্র সচিবকে প্রধান করে একটি কোর কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করব। তারা শুধু আগুন নয়, অন্যান্য দুর্যোগ যেগুলো হয়, সেসব নিয়েও যাতে যথাযথভাবে ব্যবস্থা নিতে পারি। কমিটি সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একটা প্রতিবেদন দেবে।
একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে কোনো নাশকতার শঙ্কা করছেন কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু বলতে পারছি না। বৈঠকে আমাদের সক্ষমতা ও অক্ষমতা সবটা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। বহু কিছু আছে, এ ধরনের ঘটনা তদন্ত করার মতো কারিগরি সরঞ্জাম নেই। আমাদের সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা করেছি।
বিমানবন্দরের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস সঠিক সময়ে যায়নি এবং ফায়ার সার্ভিস থেকে বলা হয়েছে, সেখানে অগ্নিনির্বাপণের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল না– এ প্রশ্নে ফারুক-ই-আজম বলেন, কিছু কিছু ঘাটতি ছিল। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ফায়ার সিস্টেম ছিল, তবে সেটি তাদের পর্যাপ্ত ছিল না। সে কারণে এটি সম্ভব হয়নি। তবে কেন আরও দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি? প্রতিবেদনটি পেলেই আমরা বিস্তারিত জানতে পারব।
ফারুক-ই-আজম বলেন, আগুন তো লাগতেই পারে। সেটি নির্বাপণের বিষয়ে সরকারের সক্ষমতা ও অক্ষমতার একটি বিষয় আছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও কিছু দায় থাকে। সেগুলো আমরা সবকিছু খতিয়ে দেখব। অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি আপনারা নিরূপণ করবেন কিনা– এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, সেটির জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি করেছে। তারা সেটি নিরূপণ করবে।



