
৭ অক্টোবর হামলার দুই বছর: নিউ ইয়র্কে স্মরণসভা, প্রতিবাদ ও শান্তির আহ্বান
স্মৃতি, শোক ও মানবিক প্রত্যাশা — শহর একত্রে, বিশ্বের নজর নিউ ইয়র্কে

হোসনেআরা চৌধুরী
নিউ ইয়র্ক, অক্টোবর ৭: দুই বছর আগে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলায় নিহত হয়েছিল প্রায় ১,২০০ মানুষ। সেই হামলার পর গাজা ও ইসরায়েলে চলমান সংঘাতের ভয়াবহতা আজও বিশ্বের নজর কেড়েছে। আজ নিউ ইয়র্কে পালিত হচ্ছে সেই দিনের দুই বছরপূর্তি—শহরজুড়ে স্মরণসভা, প্রার্থনা, প্রতিবাদ এবং যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহমর্মিতার আহ্বান।
নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের গ্রেট লন আজ জনসমাগমের এক বিশাল কেন্দ্র। এখানকার স্মরণসভায় অংশগ্রহণ করতে আসছে হাজার হাজার মানুষ। সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ১০,০০০ মানুষ উপস্থিত হবেন। এটি কেবল মৃতদের স্মরণে নয়, বরং ভবিষ্যতে শান্তি ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ারও এক প্রতীকী উদ্যোগ।
ইহুদিদের সুক্কট উৎসবের সঙ্গে মিলিত এই অনুষ্ঠানে শান্তি ও মানবিক দায়বদ্ধতার বার্তা স্পষ্ট। ইমাম, রাব্বি, সমাজকর্মী এবং ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো সবাই অংশগ্রহণ করেছেন।
নীরব শোক ও ব্যক্তিগত ক্ষতি
স্মরণসভায় উপস্থিত অনেকের জন্য আজও সেই দিনের স্মৃতি অত্যন্ত তাজা।
রাচেল গোল্ডবার্গ পলিন বলেন, “আমার ছেলে হের্শ বন্দী হয়ে নিহত হয়েছিল। এই যন্ত্রণা কখনোও মেটে না।”
অনেক পরিবার আজও সেই দিনটির ব্যথা অনুভব করছেন। তারা প্রার্থনা করছেন যেন আর কোনো শিশু নিরপরাধভাবে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। কিছু অংশগ্রহণকারী স্মৃতিসৌধে ফুল, ছবি এবং ব্যানার রেখে দিচ্ছেন।
প্রতিবাদ ও শান্তির আহ্বান
স্মরণসভা শুধু শোকের নয়, এটি প্রতিবাদ ও শান্তির আহ্বানও।
শহরের রাস্তায়, বিশেষ করে টাইমস স্কোয়ার ও ব্রুকলিন ব্রিজে, মানুষ হাতেও ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়েছেন—লিখা আছে: “Ceasefire Now,” “Stop the War,” এবং “Justice for Gaza”।
গান, স্লোগান, অশ্রু — সব মিলেমিশে তৈরি করেছে এক দ্বৈত বাস্তবতা। একপাশে ইসরায়েলি পরিবার তাদের প্রিয়জনদের স্মরণ করছে, অন্যপাশে ফিলিস্তিনি কণ্ঠ বাঁচার আহ্বান করছে।
নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি
NYPD আজ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।
টাইমস স্কোয়ার, ইউনিয়ন স্কোয়ার, জাতিসংঘ সদর দফতর, ব্রুকলিন ব্রিজ-এ মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ টহল দল, ড্রোন নজরদারি, এবং কাউন্টার-টেররিজম ইউনিট।
পুলিশ কমিশনার এডওয়ার্ড কাবান বলেন, “আমরা চাই এই দিনটি স্মরণীয় হোক মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে।
প্রত্যেকের শোক ও মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে, তবে তা হোক নিরাপদ ও শ্রদ্ধাশীল।”
ধর্মীয় নেতাদের আহ্বান ও সহমর্মিতা
ব্রুকলিনের মসজিদে ইমাম বলেন, “সৃষ্টিকর্তা যেন নিরপরাধদের কষ্ট দূর করেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন।”
ম্যানহাটনের এক রাব্বি যোগ করেন, “আমরা একই বেদনার অংশীদার। ঘৃণা নয়, সহানুভূতিই আমাদের পথ।”
শহরের বিভিন্ন সম্প্রদায় আজ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলছে—যুদ্ধের শাস্তি সবসময়ই সাধারণ মানুষকে ভোগ্য।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও কূটনৈতিক প্রত্যাশা
গাজা ও ইসরায়েলে চলমান সংঘাতের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আলোচনা হচ্ছে বন্দী বিনিময়, মানবিক সাহায্য এবং আংশিক সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, “শান্তি সম্ভব, তবে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নয়।”
হামাসের মুখপাত্র বলেন, “গাজার শিশুদের কবরের উপর শান্তি স্থাপন করা সম্ভব নয়।”
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর ৩৩,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার অধিকাংশই নারী ও শিশু।
নিউ ইয়র্কে মানবিক দ্বন্দ্ব
নিউ ইয়র্কের ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় একসঙ্গে বসবাস করলেও আজ শোকের অভিব্যক্তি ভিন্ন।
এক ইসরায়েলি মা বলেন, “আমার ছেলে আর ফিরে আসবে না, তবে আমি প্রার্থনা করি যেন আর কোনো মা সন্তান হারাতে না হয়।”
এক ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী ফিসফিস করে বলেন, “আমরা কারও বিরুদ্ধে নই; শুধু বাঁচার অধিকার চাই।”
উপসংহার: স্মৃতি থেকে আশা
দুই বছর পরও ৭ অক্টোবরের ছায়া পৃথিবীর নানা প্রান্তে অনুভূত।
নিউ ইয়র্ক, বহুভাষী ও বহুসংস্কৃতির শহর, আজ শুধু স্মরণ করছে না, বরং বলছে—যুদ্ধের ক্ষতি সাধারণ মানুষ বহন করে, আর সহানুভূতির জয়ই স্থায়ী।
“যুদ্ধ এমন ক্ষত দেয় যা সময়ও সারাতে পারে না।
কিন্তু শান্তি — যদি ফিসফিস করেও আসে — তা প্রাণ বাঁচাতে পারে।



