
অগ্নিঝরা মার্চমুক্তিযুদ্ধস্বাধীনতা
৭ মার্চের ভাষণের অপেক্ষায় সবাই
আ.লীগের জরুরি বৈঠক
৭ মার্চের ভাষণের অপেক্ষায় সবাই
জাকির হোসেন
একাত্তরের ৬ মার্চ (শনিবার) সংগ্রামী বাংলা এক বিক্ষোভে উত্তাল সমুদ্র আর অন্তহীন মিছিল-সমাবেশের প্রান্তরে পরিণত হয়। দিকে দিকে স্বাধীনতাকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা, কণ্ঠে কণ্ঠে সাগরের ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রাম শপথে শাণিত হয় বাংলার রাজপথ, মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার। রাজধানীসহ সমগ্র বাংলাদেশে এ দিন হরতাল পালিত হয়। রাজধানী ঢাকায় এদিন টানা পঞ্চম দিনের মতো সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয় এবং বাংলাবন্ধে এর পরিসমাপ্তি ঘটে।
এই দিনে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল এস এম আহসানকে অপসারিত করে লে. জেনারেল টিক্কা খানকে নতুন গভর্নর করা হয় এবং দুপুর ১টা ৫ মিনিটে রেডিও পাকিস্তানের জাতীয় অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা হয়। সন্ধ্যায় ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের প্রধান (অবসরপ্রাপ্ত) এয়ার মার্শাল আসগর খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার ধানমণ্ডিস্থ বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রায় ৪০ মিনিট আলোচনা করেন।
এদিন বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টায় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলগেট ভেঙে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে ৭ জন কয়েদি নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। পালিয়ে যায় প্রায় সোয়া তিন শত কয়েদি। আর খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ১৮ জন এবং আহত হন আরো ৮৬ জন।
এদিকে দিন যতই গড়াচ্ছিল, অসহযোগ আন্দোলনের গন্তব্যও ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপরও চাপ বাড়ছিল। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি কী ভাষণ দেবেন তা শোনার জন্য সারাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু কী ঘোষণা দেবেন তা ঠিক করতে তিনি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে কি না সেটাই ছিল প্রশ্ন।
পরদিন ৭ মার্চ (রবিবার) প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। এ দিন (৭ মার্চ, রোববার) দৈনিক ইত্তেফাক ‘২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান: আওয়ামী লীগ কমিটির জরুরি বৈঠক’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়া ইত্তেফাক ‘জাতির উদ্দেশে প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের বিবরণ’, ‘ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের গেট ভাঙিয়া সাড়ে তিন শতাধিক কয়েদীর পলায়ন: নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৭ জন নিহত, ৩০ আহত’, ‘শেখ মুজিব সকাশে আসগর খান’ শিরোনামে ৬ মার্চের (শনিবার) ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
আজাদ এদিন ‘জুলুমের জিঞ্জির ভাঙ্গবোই ’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে।

আজাদ-এ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত অন্য সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল, ৭ জন নিহত ও ৩০ জন বন্দি আহত: জেল হইতে সোয়া তিনশত কয়েদীর পলায়ন’, ‘মুজিব সকাশে আসগর খান’, ‘সংগ্রামের সহিত সাংবাদিকদের একাত্মতা ঘোষণা’, ‘আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক’, ‘২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, দেশের অখণ্ডতা রক্ষা সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব : ইয়াহিয়া’, ‘মহিলাদের বিক্ষোভ মিছিল’ ‘ শিল্পীদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা’ ইত্যাদি।
আর সংবাদ এদিন ‘২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, দেশের অখণ্ডতা নিশ্চিত করিব : ইয়াহিয়া’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৭ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়াও সংবাদ এদিন ‘গুলিতে ৭ জন নিহত : ৩০ জন আহত, কেন্দ্রীয় কারাগার ভাঙ্গিয়া ৩২৫ জন কয়েদীর পলায়ন’, ‘ঢাকা বাদে ৪টি শহরে ২ দিনে ২১৬ জন নিহত’, ন্যাপের জনসভায় অধ্যাপক মোজাফফর: মুক্তির জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত’, ‘আজ রেসকোর্সে শেখ মুজিবের ভাষণ’ শিরোনামে কয়েকটি খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
’৭১-এর ৭ মার্চ ( রোববার ) দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হল:
জাতির উদ্দেশে প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের বিবরণ
রাওয়ালপিণ্ডি, ৬ই মার্চ :
প্রেসিডেন্ট জেনারেল এএম ইয়াহিয়া খান আজ দুপুরে তাহার বেতার ভাষণে ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের উদ্বোধনী অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। জাতির উদ্দেশে সাড়ে ১২ মিনিটব্যাপী ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পরিষ্কারভাবে বলেন যে, যাহাই ঘটুক না কেন, যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রহিয়াছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রহিয়াছি, ততদিন পর্যন্ত আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করিব। এই প্রশ্নে কাহারো যেন সন্দেহ বা ভুল ধারণা না থাকে।
প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন: এই দেশকে রক্ষার জন্য পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানে কোটি কোটি বাসিন্দার নিকট তাহার দায়িত্ব রহিয়াছে। তাহারা আমার নিকট হইতে ইহা আশা করেন এবং আমি তাহাদের হতাশ করিব না।
প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি কিছুসংখ্যক লোককে কোটি কোটি নিরীহ ও নিরপরাধ পাকিস্তানির স্বদেশভূমিকে ধ্বংস করিতে দিব না। পাকিস্তানের ঐক্য, সংহতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর উপর ন্যস্ত এবং এই দায়িত্ব পালনে তাহারা কখনো ব্যর্থ হন নাই।
প্রেসিডেন্ট বলেন, শাসনতন্ত্র রচনার ব্যাপারে একটা সাধারণ ঐকমত্যে উপনীত হওয়ার জন্য আমার প্রচেষ্টা সফল হয় নাই। ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে যেসব দলের সন্দেহ রহিয়াছে, তাহাদের আমি স্মরণ করাইয়া দিতে চাই যে, আইনগত কাঠামো আদেশের চাইতে কোনো উত্তম নিশ্চয়তার প্রয়োজনীয়তা নাই। ইতিপূর্বে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট বলেন যে, পরিবেশ শাসনতন্ত্র রচনার উপযোগী ছিল না। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের বিপুলসংখ্যক প্রতিনিধি ৩রা মার্চ তারিখে অধিবেশনে যোগদান করিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছিলেন।
তিনি বলেন, আমি উক্ত সিদ্ধান্তে এই কারণে উপনীত হইয়াছিলাম যে, উক্ত তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠান নিরর্থক হইত এবং তাহার ফলে জাতীয় পরিষদই ভাঙিয়া পড়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই আমি অধিবেশন স্থগিত রাখিয়া সঙ্কট নিরসনের চেষ্টা করিয়াছি। (ইত্তেফাক: ৭ই মার্চ রোববার, ১৯৭১)

২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান
আওয়ামী লীগ কমিটির জরুরি বৈঠক
স্টাফ রিপোর্টার :
গতকাল (শনিবার) দলীয় প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও বাংলাদেশ শাখার ওয়ার্কিং কমিটির এক যুক্ত জরুরি বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গতকাল দুপুরে আগামী ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করিয়া বেতার ভাষণ দানের অব্যবহিত পরেই শেখ সাহেবের বাসভবনে এই বৈঠক শুরু হয় এবং রাত্রি পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা চলার পর উহা মুলতবি হইয়া যায়। বৈঠকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খোন্দকার মোস্তাক আহমদ ও জনাব তাজউদ্দিন আহমেদসহ গতকাল ঢাকা শহরে অবস্থানরত ওয়ার্কিং কমিটির সকল সদস্যই যোগদান করেন।
শেখ সাহেব গতকাল দুপুরে স্বীয় ভবনে বসিয়া বেতারে প্রেসিডেন্টের ভাষণ শ্রবণ করেন। বেতার ঘোষণার অব্যবহিত পরেই তিনি দলের উভয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের এক জরুরি বৈঠকের আহ্বান করেন। রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের আলোকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত বা প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণ সম্পর্কে শেখ মুজিবের প্রতিক্রিয়া কোনোটাই গভীর রাতে এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সাংবাদিকদের জানানো হয় নাই। তবে আশা করা যাইতেছে যে, শেখ সাহেব আজ (রবিবার) দুপুরে রেসকোর্সের গণসমাবেশে ভাষণদানকালে দেশের জনগণের উদ্দেশে তাহার বক্তব্য পেশ করিবেন। ( ইত্তেফাক: ৭ই মার্চ রোববার, ১৯৭১)
ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের গেট ভাঙিয়া
সাড়ে তিন শতাধিক কয়েদীর পলায়ন
নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৭ জন নিহত, ৩০ আহত
স্টাফ রিপোর্টার :
গতকাল (৬ মার্চ শনিবার) বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টায় ঢাকা সেন্ট্রাল জেল গেট ভাঙিয়া পলায়নের সময় পুলিশের গুলিতে ৭ জন কয়েদী নিহত ও ৩০ জন আহত হইয়াছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা খুবই গুরুতর বলিয়া জানা গিয়াছে।
জেলগেটের একটি অংশ ভাঙিয়া পশ্চাৎদিকের গেট টপকাইয়া ৩ শত ৪১ জন কয়েদী পলায়ন করে। তাহাদের মধ্যে পরে ১৬ জন পলায়নরত কয়েদীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হইয়াছে বলিয়া জেল কর্তৃপক্ষীয় সূত্রে জানা গিয়াছে।
গতকাল বেলা ১১টায় জেলে খাবার গ্রহণের সময় সব কয়েদী বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠে। পরে তাহারা জনৈক জেল অফিসারের অফিসের কামরার জানালা ভাঙিয়া প্রধান গেটের নিকট আসে এবং উহার ঢাকনা ভাঙিয়া কয়েদীরা পলায়ন করে। পশ্চিম দিকের গেট ও দেয়াল টপকাইয়াও বেশকিছু সংখ্যক কয়েদী পলায়ন করে। সংবাদ পাইয়া সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সশস্ত্র পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং পলায়নরত কয়েদীদের প্রতি গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে ৭ জন কয়েদীর মৃত্যু ও ৩০ জন আহত হইয়াছে বলিয়া প্রাথমিক সংবাদে জানা গিয়াছে। পলায়নরত বন্দিদের সহিত সংঘর্ষে একজন পুলিশ সার্জেন্ট ও ৬ জন জেল গার্ড আহত হইয়াছে। (ইত্তেফাক: ৭ই মার্চ রবিবার, ১৯৭১)
শেখ মুজিব সকাশে
আসগর খান
ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের প্রধান (অবসরপ্রাপ্ত) এয়ার মার্শাল আসগর খান গতকাল (শনিবার ৬ মার্চ) সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শেষোক্তের ধানমণ্ডিস্থ বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল শেখ সাহেবের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট অবস্থান করেন এবং পরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, যাতে তেমন কোনো অবস্থার সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। তাহাকে প্রশ্ন করা হইলে তিনি বলেন, আমার পক্ষে ইহার বেশি কিছু বলা ঠিক হইবে না। কারণ শেখ সাহেব রবিবারে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিবেন।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল গত শুক্রবার (৫ মার্চ) ঢাকায় পৌঁছিয়া শেখ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন, গতকালের (৬ মার্চ) সাক্ষাৎকার ছিল দ্বিতীয় সাক্ষাৎকার। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগের পূর্বে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতাদান করিবেন।( ইত্তেফাক: ৭ই মার্চ রবিবার, ১৯৭১)
ঢাকার রাজপথে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা
কণ্ঠে কণ্ঠে ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ
স্টাফ রিপোর্টার :
সংগ্রামী বাংলা যেন এক বিক্ষুব্ধ সমুদ্র- এক অন্তহীন সভা-সমাবেশ-মিছিলের দেশ। দিকে দিকে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা- কণ্ঠে কণ্ঠে উত্তাল সাগরের ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ আর বাতাসে বাতাসে জাগ্রত গণশক্তির হৃদয় সঙ্গীত ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’।
বাংলার স্বাধিকারকামী আন্দোলনের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে গতকালও (৬ মার্চ শনিবার) রাজধানীসহ সমগ্র বাংলাদেশে হরতাল পালিত হয়। আর রাজপথে-জনপদে নামিয়া আসে স্বাধিকারকামী জনতার অগণিত মিছিল, অনুষ্ঠিত হয় অসংখ্য সভা-সমাবেশ।
সেই সভা-সমাবেশের প্রস্তাবে, মিছিলকারীদের শ্লোগানে শ্লোগানে এক কথাই বার বার বাগ্মময় হইয়া উঠে- ‘যদি চাও রক্ত নেবে, তবু স্বাধিকার দিতেই হবে।’
রাজধানী ঢাকায় গতকাল পঞ্চম দিবসের মতো হরতাল পালিত হয়। …
গতকালও (৬ মার্চ শনিবার) সকাল হইতে রাজপথে জনতার স্রোত নামিয়া আসে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে সভা-সমাবেশ।
ঢাকায় গতকাল (৬ মার্চ শনিবার) আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার উদ্যোগে এক বিরাট মহিলা শোভাযাত্রা বাহির করা হয়। সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে এক বিরাট মশাল শোভাযাত্রা বাহির হয়। ইহা ছাড়া পেশাদার সাংবাদিকদের উদ্যোগে সভা ও মিছিল, প্রাথমিক শিক্ষকদের উদ্যোগে মিছিল, শিল্পীদের উদ্যোগে সমাবেশ ও মিছিল, ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) উদ্যোগে মিছিল, গণশিল্পী গোষ্ঠীর উদ্যোগে মিছিল, বাংলা ন্যাশনাল লীগের উদ্যোগে জনসভা ও মিছিল এবং ফরোয়ার্ড স্টুডেন্টস ব্লকের উদ্যোগে মিছিলের আয়োজন করা হয়। (ইত্তেফাক: ৭ই মার্চ রবিবার, ১৯৭১)



