প্রধান খবরবাংলাদেশ

বাবা-ছেলের সিন্ডিকেটে চলেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ছেলে সাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতি। তার বিরুদ্ধে আছে চাঁদাবাজির অভিযোগও। মন্ত্রীর বাসায় বস্তায় বস্তায় টাকা প্রবেশের নেপথ্যে কাজ করেছেন জ্যোতি। বাবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেছেন তিনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ঘিরে বাবা-ছেলে মিলে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে বিপুল অবৈধ সম্পদ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধু অনপনেয় বা অমোছনীয় কালি কেনার ক্ষেত্রে যে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, এর সঙ্গেও ওই সিন্ডিকেট জড়িত বলে বেরিয়ে এসেছে। ঢাকার আশুলিয়া থানার একটি মামলায় গ্রেফতারের পর রোববার জ্যোতিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে তিনি পুলিশকে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দিচ্ছেন।

সূত্র জানায়, কেবল মন্ত্রণালয় বা এর অধীন প্রতিষ্ঠানেই নয়, বাইরেও দাপট দেখাতেন সিন্ডিকেট সদস্যরা। রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় ছিল জ্যোতির একচ্ছত্র আধিপত্য। ধানমন্ডি এলাকায় কোনো রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করতে গেলে জ্যোতিকে চাঁদা দিতে হতো। তাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিলে অনায়াসেই মিলত রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স। রেস্টুরেন্ট থেকে চাঁদা ছাড়াও কাওরান বাজার থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হতো। ফুটপাতে ব্যবসা, বাজার, মাদক ব্যবসায়ী ও আবাসিক হোটেল থেকে উঠত চাঁদা। এ টাকা মন্ত্রীর হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দায়িত্ব ছিল মন্ত্রীর এপিএস মনির হোসেনসহ আরও দুইজনের ওপর। এ টাকার মোটা অংশ পেতেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। পাশাপাশি এ টাকার একটা ভাগ পেতেন তার ছেলে। সূত্র জানায়, গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আন্দোলন নেতৃত্বহীন করতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে তুলে নেওয়ার নির্দেশও এসেছিল তার কাছ থেকে। আন্দোলন দমাতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার নির্দেশও দেন জ্যোতির বাবা আসাদুজ্জামান।

সূত্র জানায়, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্ত্রী লুৎফুল তাহমিনা খান, ছেলে জ্যোতি, মেয়ে সোফিয়া তাসনিম খান এবং একান্ত সচিব মনির হোসেনকে আসামি করে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক। অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাতে দেশের বাইরে পালাতে না পারেন, সেজন্য ইতোমধ্যে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঘুস হিসাবে বস্তা বস্তা টাকা নিতেন। পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস থেকে এ টাকা আদায় করা হতো। ঘুস আদায়ে তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ড. হারুন অর রশীদ বিশ্বাসের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তৎকালীন মন্ত্রী। এ সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন যুগ্মসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মনির হোসেন, জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা ইব্রাহিম হোসেন ও মন্ত্রীর ছেলে সাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতি। টাকা আদায় বা উত্তোলনে মূল ভূমিকা পালন করতেন ড. হারুন অর রশীদ বিশ্বাস। একপর্যায়ে হারুন অর রশীদ অবসরে গেলেও মন্ত্রণালয়ের সব ঘুস, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন জ্যোতি। ঝুঁকি এড়াতে ঘুসের টাকা পাঠানো হয় দেশের বাইরে। অভিযোগ আছে, জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগে ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা নিত বাবা-ছেলের চক্র। এছাড়া পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে এক থেকে তিন কোটি টাকা আদায় করেছে এ সিন্ডিকেট। ২০২২ সালে একটি মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার নিয়োগে সিন্ডিকেট সদস্যরা পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সূত্র জানায়। আরও জানায়, এনজিওর ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা ‘এনওসি’ দিতে গিয়ে প্রতি সংস্থা থেকে ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা দিতে হতো আসাদুজ্জামান খান কামালের সিন্ডিকেটকে। দুর্নীতির তথ্য পেতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের দপ্তরে দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত কম্পিউটারের সিপিইউ ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করার অনুমতি পেয়েছে দুদক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর ৫৩৫ জনকে নিয়োগ দেয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। এর মধ্যে ছিলেন ৪৩৬ জন পুরুষ, ১৫ জন নারী ফায়ারফাইটার এবং ৮৪ জন গাড়িচালক। নিয়োগ কার্যক্রমের শুরুতেই মন্ত্রীর দপ্তর থেকে ২৫০ জনের একটি তালিকা পাঠানো হয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে। সাবেক এই মন্ত্রীর নির্দেশে সেই তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় ফায়ার সার্ভিস। নিয়োগের জন্য জনপ্রতি ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা নিত কামাল-হারুন সিন্ডিকেট।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশের এসআই ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগের মাধ্যমে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের সিন্ডিকেট এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি গোপন প্রতিবেদন জমা হয়েছে। এ নিয়োগ দুর্নীতিতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে একেকজন প্রার্থীর কাছ থেকে ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঘুস নিয়ে পছন্দের তালিকা তৈরি করা হয়।

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension