আন্তর্জাতিকপ্রধান খবর

ফরেন পলিসির নিবন্ধ: পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে কোন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাচ্ছে ভারত

ভারতীয় নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার দুই সপ্তাহ পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে। কেবল তাই নয়, এর আগে ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে দেশটির বিরুদ্ধে ব্যাপক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। পাকিস্তান দৃঢ়ভাবে এই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভারত সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বুধবার (মঙ্গলবার দিবাগত রাতে) ভোরের আগে স্থানীয় সময় অনুযায়ী পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর এবং পাঞ্জাব প্রদেশে ৯টি সন্ত্রাসী আস্তানাকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই হামলায় সামরিক লক্ষ্যবস্তু এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা না বাড়ানো।

পাকিস্তান ভারতের এই হামলাকে যুদ্ধ ঘোষণা বলে নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, এই হামলায় মসজিদসহ বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন। এরপরই পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব দেয়। কাশ্মীরে দুই দেশের সীমান্ত বরাবর তীব্র গোলাবর্ষণ করা হয়। পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। নয়া দিল্লি স্বীকার করেছে, তাদের অন্তত দুটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

সামরিক পদক্ষেপ না নিলে তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতো। মোদি সরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য পরিচিত। পেহেলগাম হামলার নৃশংসতার পর তাদের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ ছিল। ভারত স্পষ্টভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছিল। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তারা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। সারা দেশে বেসামরিক প্রতিরক্ষা মহড়ার নির্দেশ দিয়েছে।

আগামী দিনগুলোতে এই সংকটের সামরিক দিকগুলোর ওপর মনোযোগ থাকবে। ভারতের এই হামলা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উচ্চ-তীব্রতার শক্তি প্রয়োগ ছিল। সম্ভবত এটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলা। তবে এই হামলাকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো সীমান্ত-পারের সন্ত্রাসবাদকে চিরতরে নির্মূল করা।

পেহেলগাম হামলার পর থেকে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক কৌশল বহির্ভূত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নজিরবিহীন। নয়া দিল্লি ইসলামাবাদ থেকে সমস্ত আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পরিচালিত বাণিজ্যও এর অন্তর্ভুক্ত। দুই দেশের একমাত্র স্থল সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করা হয়েছে। এটি একটি আন্তসীমান্ত জল ব্যবস্থাপনা চুক্তি।

ভারত পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক দাতাদেরও দেশটিতে সহায়তা কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। তারা একটি প্রভাবশালী বৈশ্বিক সন্ত্রাসী অর্থায়ন পর্যবেক্ষণ সংস্থাকেও ইসলামাবাদের রেকর্ড খতিয়ে দেখতে বলতে পারে। দেশটির অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে, পানি সংকটকে কাজে লাগিয়ে এবং পাকিস্তানকে বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্ন করে নয়া দিল্লি একটি দীর্ঘমেয়াদি খেলা খেলছে। এর লক্ষ্য হলো, ভারতের ওপর হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ব্যবস্থা না নিলে তাদের জন্য ক্ষতির পরিমাণ বাড়ানো।

পাকিস্তানকে কোণঠাসা করার ভারতের এই বহুমুখী প্রচেষ্টা সম্ভবত এই উপলব্ধি থেকে এসেছে যে, নয়াদিল্লি বুঝতে পেরেছে—সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ দমনের আগের কৌশলগুলো যথেষ্ট ছিল না। এর মধ্যে সীমিত সামরিক পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া, পারমাণবিক ডিটারেন্ট ও পাকিস্তানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার কারণে ভারতের সামরিক বিকল্প তুলনামূলকভাবে সীমিত। গতকাল বুধবার ভারত যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার বাইরে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব নয়।

শেষ পর্যন্ত এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলটি উচ্চাভিলাষীই হবে। ভারত-পাকিস্তান বাণিজ্য শুরু থেকেই এত সীমিত ছিল যে, এটি বন্ধ করে দিলে বড় কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে না। পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন করাও সহজ হবে না। কারণ, পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু (চীন এবং সৌদি আরব) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্ক) প্রভাবশালী বিশ্ব শক্তি। এ ছাড়া পাকিস্তান এমন বহুদেশীয় ফোরামের সদস্য যারা দেশটিকে সমর্থন করে।

যে ক্ষেত্রে ভারত সত্যিই পাকিস্তানকে ঠেকিয়ে দিতে পারে সেগুলোর একটি হলো—দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো তৈরি করে পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ রোধ করা। এটি ইসলামাবাদকে আরও খেপিয়ে দিতে পারে। ফলে তারা ভারতবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে উৎসাহিত হতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ ‘জঙ্গিদেরও’ উসকে দিতে পারে। পাকিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়্যবা এর আগে ভারতের ‘পানি চুরি’র কথা উল্লেখ করে দেশটির ওপর হামলার হুমকি দিয়েছিল।

মূল বিষয় হলো, চার বছরের তুলনামূলক শান্তির পর ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক গভীর সংকটের দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। দুই দেশ সীমিত সংঘাতের তাৎক্ষণিক ঝুঁকির সম্মুখীন। তবে এর বাইরেও, পাকিস্তানকে একটি বহুমুখী চাপের লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো—এমন এক হুমকি (পাকিস্তানকে) দমন করা, যা নিয়ন্ত্রণ করতে ভারত হিমশিম খাচ্ছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension