আন্তর্জাতিকপ্রধান খবরযুক্তরাষ্ট্র

আলাস্কা বৈঠক থেকে কী চান পুতিন ও ট্রাম্প?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় মার্কিন ও রুশ প্রেসিডেন্টের মধ্যে বৈঠকের দিকে নজর বিশ্ববাসীর। বৈঠক থেকে দুই নেতা কী চাইছেন, ফলাফলই বা কী হবে তা জানতে উন্মুখ সবাই।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৈঠকে বসছেন ইউক্রেইন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা করতে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য আলাস্কায় শুক্রবার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

এই বৈঠকের ওপর নজর বিশ্ববাসীর। বৈঠক থেকে আসলে কী চাচ্ছেন ট্রাম্প ও পুতিন আর বৈঠকের ফলই বা কী হবে তা জানতে উন্মুখ সবাই।

বিবিসি লিখেছে, এই শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতার চাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা। পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেইনের ভূখণ্ড দখলে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প যে বিশ্বে শান্তির দূত হিসেবে ভূমিকা রাখতে চান তা নিয়ে কোনও রাখঢাক করেননি।

বৈঠক থেকে দুই নেতার চাওয়া কী হতে পারে তার বিস্তারিত খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে বিবিসি:

পুতিনের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি… এবং আরও কিছু:

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া এই স্বীকৃতি প্রমাণ করছে, পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেমলিন নেতাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজন এবং ক্রেমলিনের ঘোষিত যৌথ সংবাদ সম্মেলন—দুটোই এই বাস্তবতার প্রমাণ। মস্কো এখন বলতে পারছে, রাশিয়া আবার বৈশ্বিক রাজনীতির ‘টপ টেবিল’-এ ফিরে এসেছে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া শীর্ষ বৈঠকই নয়, বরং পুতিন এই বৈঠকের জন্য এমন একটি বিশিষ্ট ভৌগোলিক স্থান (আলাস্কা) পেয়েছেন, যা ক্রেমলিনের জন্য নানা সুবিধা বয়ে আনছে।

প্রথমত, নিরাপত্তা। নৈকট্যের দিক থেকে আলাস্কার মূল ভূখণ্ড রাশিয়ার চুকোটকা অঞ্চল থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে। ফলে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ কোনও দেশের আকাশপথ ব্যবহার না করেই পুতিন সেখানে যেতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, আলাস্কা ইউক্রেইন ও ইউরোপ থেকে অনেক দূরে—খুবই দূরে। এটি ক্রেমলিনের জন্য ভাল, কারণ তারা কিইভ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের পাশ কাটিয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়।

এখানে ঐতিহাসিক প্রতীকও আছে। ১৯ শতকে জারতান্ত্রিক রাশিয়া আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করেছিল। মস্কো এখন এই ইতিহাস ব্যবহার করছে ২১ শতকে বল প্রয়োগ করে সীমান্ত বদলের যৌক্তিকতা হিসেবে।

মস্কোভোস্কি কোমসমোলেটস লিখেছে—“আলাস্কা স্পষ্ট উদাহরণ যে, রাজ্যের সীমান্ত বদলাতে পারে এবং বড় ভূখণ্ডের মালিকানা পরিবর্তন হতে পারে।”

তবে শুধু প্রতীকী অর্জন আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতেই পুতিনের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান ‘জয়’।

পুতিন ইউক্রেইনের চারটি অঞ্চলে (দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝিয়া ও খেরসন) রাশিয়ার দখল করা জমি ধরে রাখা এবং অঞ্চলগুলোর যে অংশ এখনও ইউক্রেইনের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখান থেকে কিইভের সরে যাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।

কিন্তু ইউক্রেইনের জন্য এই শর্ত অগ্রহণযোগ্য। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—“ইউক্রেইনীয়রা তাদের জমি দখলদারদের হাতে তুলে দেবে না।”

ক্রেমলিনও তা জানে। তবে তারা হিসাব করছে- যদি ট্রাম্প রাশিয়ার দাবি সমর্থন করেন, তাহলে ইউক্রেইন তা প্রত্যাখ্যান করলে যুক্তরাষ্ট্র কিইভের জন্য সব রকম সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারে। আর তেমন হলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাবে।

তবে আরেকটি সম্ভাবনাও আছে। রাশিয়ার অর্থনীতি চাপের মুখে। বাজেট ঘাটতি বাড়ছে, তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে আয় কমছে। যদি এই অর্থনৈতিক সংকট পুতিনকে যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য করে, তবে ক্রেমলিন কোনও ধরনের সমঝোতায় রাজি হতে পারে।

তবে আপাতত এমন কোনও ইঙ্গিত নেই। রুশ কর্মকর্তারা এখনও বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া তৎপরতা ধরে রেখেছে।

ট্রাম্পের লক্ষ্য শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিদার হওয়া:

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেইন যুদ্ধ শেষ করা তার জন্য সহজ হবে, এবং তিনি তা কয়েক দিনের মধ্যেই করতে পারবেন।

কিন্তু গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ইউক্রেইন যুদ্ধ সমাধানের চেষ্টা চলতে থাকার মধ্যে তার সেই প্রতিশ্রুতি ঝুলে আছে। এর মধ্যে সময়ে সময়ে ট্রাম্প ইউক্রেইন ও রাশিয়া—উভয়ের ওপরই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে এক নাটকীয় বৈঠকে তিনি ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির তীব্র সমালোচনা করেন এবং এক পর্যায়ে সামরিক সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প পুতিনের অনমনীয়তা ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নিন্দা করেছেন এবং একাধিকবার রাশিয়া ও তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন।

গত শুক্রবার ছিল সম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার জন্য শেষ সময়সীমা। কিন্তু আগের সব বারের মতো এবারও ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সেসব সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছেন।

এবার তিনি রুশ প্রেসিডেন্টকে আমেরিকার মাটিতে স্বাগত জানাচ্ছেন এবং ‘ভূমি-বিনিময়’ নিয়ে কথা বলছেন—যা ইউক্রেইনের কাছে মনে হতে পারে শান্তির বিনিময়ে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া।

তাই পুতিনের সঙ্গে শুক্রবারের বৈঠকে ট্রাম্প কী চান, সে প্রসঙ্গে কোনও বিচারবিশ্লেষণ করা কঠিন তার দোদুল্যমান অবস্থান এবং কথাবার্তার কারণে।

এই সপ্তাহে ট্রাম্প সচেতনভাবে বৈঠক নিয়ে প্রত্যাশা কমিয়ে দিচ্ছেন—সম্ভবত এটি তার এক নীরব স্বীকারোক্তি যে, যুদ্ধে একপক্ষ উপস্থিত থাকলে বড় কোনও সাফল্যের সম্ভাবনা সীমিত।

সোমবার তিনি বলেছিলেন, এই শীর্ষ বৈঠক হবে মূলত একটি ‘পরিস্থিতি বোঝার’ মিটিং। তার ভাষায়, “সম্ভবত প্রথম দুই মিনিটেই আমি বুঝে যাব, সমঝোতা সম্ভব কি না।

“আমি হয়ত উঠে চলে গিয়ে বলব‘গুড লাক’—আর সেটাই হবে বৈঠকের ইতি। আমি হয়ত এও বলতে পারি যে, এর কোনও মীমাংসা হবে না”

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটও এই বার্তা জোর দিয়ে বলেছেন—বৈঠকটি হবে মূলত ‘শুনে যাওয়ার বৈঠক’।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রায়ই ‘অপ্রত্যাশিত’ কিছু প্রত্যাশা করাটাই সবচেয়ে ভাল। তাই বুধবার জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতারা তার সঙ্গে কথা বলেছেন, যাতে তিনি এমন কোনও চুক্তি না করেন, যা ইউক্রেইন মানতে পারবে না।

তবে একটি বিষয় কার্যত সব সময়ই স্পষ্ট- যুদ্ধ শেষ করার কৃতিত্বের দাবিদার হওয়ার সুযোগকে ট্রাম্প স্বাগত জানাবেন। ট্রাম্প উদ্বোধনী ভাষণেই তার শান্তির দূত হওয়ার আকাঙ্খার কথা বলেছিলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য তার আকাঙ্খাও গোপন কিছু নয়।

ট্রাম্প আলোচনার মধ্যে আটকে যাওয়ার মানুষ নন। তবে আলাস্কার অ্যাংকরিজের বৈঠকে আলোচনার সময় শান্তির পথে অগ্রগতি দাবি করার সুযোগ যদি তার থাকে, তাহলে তিনি তা নেবেন।

পুতিন সবসময়ই একজন বুদ্ধিমান আলোচক। তিনি ট্রাম্পকে তা করতে দেওয়ার পথ খুঁজতে পারেন। রাশিয়ার নিয়মমাফিকই তিনি তা করবেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension