সম্পাদকীয়যুক্তরাষ্ট্র

নিউইয়র্কের চিঠি: ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমেরিকান ভোটাররা কার্যত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় অবশ্যম্ভাবী ছিল। কিন্তু এত বিপুল ব্যবধানে তাদের পরাজয় হবে, এমন ধারণা করেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জরিপ সংস্থাগুলো।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির জোয়ার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অত্যন্ত অজনপ্রিয় ও বিতর্কিত একজন প্রেসিডেন্টের প্রতি তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার, যিনি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আধিপত্য বিস্তার করে ছিলেন।

তিনি তার পূর্বসূরিদের তুলনায় সচেতনভাবেই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের ওপর একটি গণভোটে রূপ দিয়েছিলেন; শেষ পর্যন্ত তাকেই এর মাশুল দিতে হলো। প্রত্যাশা কম থাকার মধ্যে এক ধরনের স্বাধীনতা থাকে। সব হিসাবনিকাশ ওলটপালট হয়ে গেছে।

৩ নভেম্বর মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের পক্ষে যে পূর্বাভাসগুলো ছিল, সেগুলো এখন রীতিমতো রসিকতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। তারা তার ক্ষমতা খর্ব করার পক্ষে একচ্ছত্র রায় দিয়েছেন।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ, উচ্চ আদালতের বিচারপতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিনেটের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের। ডেমোক্র্যাটরা তাদের নিজস্ব এজেন্ডাগুলোকে সামনে আনতে পারবেন, কংগ্রেসের সাংবিধানিক অধিকার বজায় রাখতে পারবেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে তার দলের হতাশাজনক পরাজয় তার প্রশাসন ও দলের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা। একটি শত্রুভাবাপন্ন কংগ্রেস, লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পাওয়া মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা, তলানিতে ঠেকে যাওয়া জনপ্রিয়তা নিয়ে ট্রাম্পকে নতুন বছরে পা ফেলতে হবে।

তার বিপদ শুধু কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ে নয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তে তার নিজ দলের ভেতরের ঘনিষ্ঠ বলয়ে যে ফাটল ধরেছে, সেটিও তার জন্য বিপদের বড় কারণ হবে। প্রতিনিধি পরিষদে এখন ডেমোক্র্যাটদের আসন সংখ্যা ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত ২১৪ থেকে বিস্ময়করভাবে ২৫৮ আসনে উন্নীত হয়েছে। রিপাবলিকানদের আসন সংখ্যা ২১৮ থেকে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৭ আসনে।

হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮ আসন। ডেমোক্র্যাটরা সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে সিনেটে। ১০০ আসনের সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ২০২৪ সালের ৪৭ আসন থেকে ৫৪টি আসনে বিজয় নিশ্চিত করেছে। রিপাবলিকানদের সিনেট আসন ২০২৪ সালের ৫৩ আসন থেকে হ্রাস পেয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে ৪৪টিতে।

নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্প-যুগের অবসান বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অসীম। কংগ্রেসে যদি প্রেসিডেন্টের নিজ দলের নিয়ন্ত্রণ নাও থাকে, তা সত্ত্বেও তার নির্বাহী এখতিয়ার হ্রাস পায় না।

কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ওপর তিনি ভেটো প্রয়োগ করার অধিকারী এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষ যদি কোনো বিল পাসও করে, তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে পাস করা বিল আইনে পরিণত করার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন, বিলে স্বাক্ষর না করে। প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে তা কাটাতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। ফলে বাজেট, সরকারি ব্যয় ও গুরুত্বপূর্ণ আইন নিয়ে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সমঝোতার প্রয়োজন পড়বে।

২০২৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য হোয়াইট হাউজে ফিরে আসার পর প্রথম কয়েক মাস ধরে তিনি যখন একের পর এক নির্বাহী আদেশ জারি করছিলেন, তখন আমেরিকানরা সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। বাস্তবে হচ্ছিল তা-ই।

তিনি প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজান, বেশকিছু ফেডারেল প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন, ফেডারেল চাকরি থেকে হাজার হাজার লোককে বরখাস্ত এবং অসংখ্য পদে অনুগত ও অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশেষত যেসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ডেমোক্র্যাট অনুরাগী হিসাবে পরিচিত, তাদের ওপর তার নিজস্ব সামাজিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেন।

হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া, কর্নেল, ইয়েল, প্রিন্সটন, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, ডিউক, ব্রাউন ও ইয়েলসহ অনেক বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেডারেল অনুদান বন্ধ করে দেন। মনে হচ্ছিল, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছেন।

শুধু তাই নয়, তিনি কার্যকরভাবে কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা হরণ করেছিলেন এবং কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করে তার মর্জিমাফিক করদাতাদের ওপর নানাভাবে করের বোঝা আরোপ করেছিলেন। তিনি সব ধরনের বাড়াবাড়ি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কারণ তিনি নিজেকে সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতার চেয়ে বেশি শক্তিশালী মনে করেছিলেন। তিনি তার প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল ও কোণঠাসা করে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন বলেও মনে করেছেন। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তিনি আমেরিকানদের তার সিদ্ধান্ত মেনে চলতে বাধ্য করতে পারবেন।

পরিস্থিতি বাস্তবেও এমন দাঁড়িয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাড়াবাড়ি প্রতিরোধ করার শক্তি ডেমোক্র্যাটদের ছিল না। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের ক্ষমতার চিত্র পুরোপুরি পালটে দিয়েছে। ২০২৪ সালে ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হয়ে কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করে আমেরিকার সমগ্র অভিবাসী কমিউনিটিকে ক্ষুব্ধ ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে রেখেছিলেন। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একতরফা ট্যারিফ বৃদ্ধি করে বাস্তবে নিজ দেশে মূল্যস্ফীতি ঘটিয়ে জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধির কারণ ঘটিয়েছিলেন, যা রিপাবলিকানদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, ভোক্তাদের অসহায়ত্ব, ধারাবাহিক বেকারত্ব এবং চোখে পড়ার মতো বৈষম্য, ইসরাইলে পরিচালিত গাজায় হত্যাযজ্ঞ বন্ধে ভূমিকা না রাখা এবং সর্বশেষ ইরানের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে জড়ানোর ঘটনা সাধারণ আমেরিকানদের যে কতটা ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল, মঙ্গলবারের নির্বাচনে তা প্রমাণিত হয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল কেমন হতে পারে-প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দল, এমনকি বেশির ভাগ জরিপ সংস্থা ও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেন উপলব্ধি করতে পারেননি, তা রীতিমতো বিস্ময় উদ্রেক করে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার অক্টোবরের প্রথমদিকে তাদের এক জরিপে দেখিয়েছে, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড ও তার লাগামহীন কথাবার্তায় প্রতি ১০ জন আমেরিকানের মধ্যে ৭ জনই অসন্তুষ্ট। প্রতি দশে মাত্র ৩ জন ট্রাম্পের কাজকর্মে সন্তোষ প্রকাশ করলে তার প্রতি জনগণের আস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা অনুমান করতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে জনগণের অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও প্রশাসনের নীতির প্রতি অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে, এবং এ অসন্তোষ শুধু ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্যগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল না, অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছিল ‘রেড স্টেট’ বা চরম রক্ষণশীল ও ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্য হিসাবে খ্যাত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-নর্থ ক্যারোলিন, সাউথ ক্যারোলিনা, ওহাইয়ো, ক্যানসাস, আইওয়া ও টেক্সাস। বিশেষ করে টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্য, যেখানে ১৯৮৮ সালের পর সিনেট নির্বাচনে এই প্রথম ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জয়ী হয়েছে।

মিশিগানে সিনেটর পদে প্রার্থী ছিলেন ডেমোক্র্যাট মুসলিম আবদুল আল-সায়েদ। সিনেটে একজন মুসলিম সিনেটরের ধারণা মেনে নিতে পারছিলেন না সেখানকার রক্ষণশীলরা। তার বিরুদ্ধে প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে ইহুদিবাদী লবিস্ট গ্রুপ। ট্রাম্প স্বয়ং সেখানে তার দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে আল-সায়েদকে আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করেন। কিন্তু আল-সায়েদ ট্রাম্প ও তার কট্টর সমর্থকদের মুখে চুনকালি দিয়ে আমেরিকার ইতিহাসে সর্বপ্রথম একজন মুসলিম সিনেটর হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

আরও কিছু ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ায় দলটির নেতা হাকিম জেফরিস নিম্নকক্ষের স্পিকার নির্বাচিত হবেন, এমন সম্ভাবনা রয়েছে। এবং যদি তা হয়, তাহলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজধানী আটলান্টা সিটির সাবেক মেয়র কেইশা ল্যান্স বোটমস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটন। ওহাইয়োর ইতিহাসে তিনি প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হলেন। কংগ্রেস ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় স্থান করে নিয়েছেন মুসলিম এবং দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত একাধিক রাজনীতিক। এছাড়া এই নির্বাচনে নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বিপুল আগ্রহ দেখা যায় তা স্বাভাবিক। যদিও বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাব আগের চেয়ে হ্রাস পেয়েছে, তবুও তা এখনো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং আমেরিকান ভোটারদের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension