
মূল্যস্ফীতির আগুনে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস!
অর্থনৈতিক অসন্তোষে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়, এপি’র এক লাখের বেশি ভোটারের জরিপে চাঞ্চল্যকর চিত্র; দুই-তৃতীয়াংশের চোখে ট্রাম্পের নীতিই মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী, ৭০ শতাংশের মতে অর্থনীতি ধনীদের পক্ষে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ও এআই নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
শাহ্ জে. চৌধুরী :
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের পরাজয়ের পেছনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ ভোটারদের ক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান দাম, জ্বালানি ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ খরচ এবং ধনী-গরিবের অর্থনৈতিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন ভোটাররা।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (AP) প্রকাশিত AP Voter Poll-এ উঠে এসেছে, অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এবারের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে এক লাখের বেশি ভোটারের ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতির প্রতি আস্থা কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে এই অসন্তোষের প্রতিফলন স্পষ্ট।
মূল্যস্ফীতির দায় ট্রাম্পের নীতিতে দেখছেন ভোটাররা
জরিপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্পের নিজস্ব নীতিই মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসন মূল্যবৃদ্ধির জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করার চেষ্টা করলেও ভোটারদের বড় অংশ সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ শতাংশ। পরবর্তী ১২ মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
ক্যালিফোর্নিয়া থেকে মিসিসিপি—বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের মধ্যে আমদানি পণ্যের ওপর ট্রাম্পের শুল্কনীতির কার্যকারিতা নিয়েও নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। অনেকের ধারণা, এই নীতি অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল দেওয়ার পরিবর্তে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপিয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয়ই ছিল ভোটের বড় নির্ধারক
জরিপে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় তাঁদের কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথবা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এই ভোটারদের প্রায় ৬০ শতাংশ তাঁদের স্থানীয় প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন।
মুদি দোকানের বাজার, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, গাড়ি মেরামত এবং চিকিৎসার ব্যয়—প্রতিদিনের এসব খরচ সাধারণ পরিবারের আর্থিক অবস্থাকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের চেয়ে নিজেদের পকেটের বাস্তব অবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ভোটাররা।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসোলিনের খরচও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
অর্থনীতি বাড়লেও সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ
জরিপে উঠে এসেছে অর্থনীতির একটি বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র। একদিকে চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের S&P 500 সূচক ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশে রয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির কিছু ইতিবাচক সূচক রয়েছে।
কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো মনে করছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ অনেক বেশি বেড়েছে।
অর্থনীতির এই বৈপরীত্যই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ধনীদের সম্পদ বাড়ছে, বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ
এপি জরিপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধনীদের বেশি সুবিধা দিচ্ছে। বিপরীতে মাত্র ৩০ শতাংশের মতো ভোটার মনে করেন, অর্থনীতি সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্য।
মেটার মার্ক জাকারবার্গ, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ধনকুবেরদের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনায় এসেছে।
এমনকি ক্যালিফোর্নিয়ার মতো প্রযুক্তিনির্ভর অঙ্গরাজ্যে ২০২৫ সালে যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় ৩ লাখ ডলারের বেশি, তাঁদের মধ্যেও অধিকাংশ মনে করেন অর্থনীতি ধনীদের পক্ষেই বেশি কাজ করছে।
অর্থাৎ অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নটি শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ এবং এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে এ নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও বাড়ছে। জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমাজের জন্য ইতিবাচক প্রভাবের তুলনায় নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলতে পারে।
বিশেষ করে প্রযুক্তির কারণে প্রচলিত কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, বিভিন্ন পেশায় মানুষের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শেয়ারবাজারে এআইনির্ভর বিনিয়োগের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার অব্যাহত থাকলেও এর জন্য কার্যকর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি বাড়ছে। তবে জরিপে মাত্র এক-চতুর্থাংশ ভোটার এআইকে তাঁদের ভোটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় কমাতে সরকারের ভূমিকা চান ভোটাররা
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়েও ভোটারদের অসন্তোষ স্পষ্ট। চিকিৎসা, হাসপাতালের বিল, ওষুধ এবং স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে উঠেছে।
জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মোকাবিলায় সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা চান। অধিকাংশ ভোটারের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমার পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
এ কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসার সহজলভ্যতা এবং সাধারণ পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
নিম্ন আয়ের পরিবার সবচেয়ে বেশি চাপে
এপি জরিপে আয়ের ভিত্তিতে ভোটারদের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।
যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় ৫০ হাজার ডলারের নিচে, তাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশ জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগের দুই বছরের তুলনায় তাঁদের আর্থিক অবস্থা এখন খারাপ।
অন্যদিকে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। তবে তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, সরকারি জবাবদিহি ও দুর্নীতি।
২০২৫ সালে যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় ২ লাখ ডলারের বেশি, তাঁদের প্রায় ৪০ শতাংশ গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে ভোটের প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
দুর্নীতি ও গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন
জরিপে শুধু অর্থনীতি নয়, সরকারি দুর্নীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও ভোটারদের উদ্বেগ উঠে এসেছে।
অর্ধেকের বেশি ভোটার বলেছেন, সরকারি দুর্নীতি তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় কংগ্রেস যথেষ্ট ভূমিকা পালন করছে না।
প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের মতে, ট্রাম্পের অগ্রাধিকার সঠিক নয়। অধিকাংশ ভোটারের ধারণা, প্রেসিডেন্ট তাঁদের মতো সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখছেন না।
নির্বাচনের ফলাফলে কী বার্তা পেল হোয়াইট হাউস?
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটাররা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা দলীয় প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেননি; তাঁরা মূল্যায়ন করেছেন নিজেদের আয়, ব্যয়, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে তাদের প্রতি নিঃশর্ত জনসমর্থন হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। জরিপে দুই দলের প্রতিই ভোটারদের অসন্তোষের চিত্র রয়েছে। তবে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় অনেক ভোটার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের বেছে নিয়েছেন।
নতুন কংগ্রেসের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনের বার্তা স্পষ্ট—অর্থনীতির সাফল্য শুধু শেয়ারবাজারের উত্থান কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের জীবন কতটা স্বস্তিদায়ক হলো, সংসারের ব্যয় কতটা সামলানো গেল এবং ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ—ভোটের বাক্সে তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন মার্কিন ভোটাররা।



