যুক্তরাষ্ট্র

এআই বিপ্লবের পথে ভোটারদের বিদ্রোহ!

ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাধার মুখে সিলিকন ভ্যালি, অনিশ্চয়তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের সঙ্গে বাড়ছে এআইবিরোধী জনমত; ওহাইও, টেক্সাস, জর্জিয়া ও মিশিগানে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণে কড়াকড়ির দাবি। OpenAI-সহ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনায় নতুন অনিশ্চয়তা।

হোসনেআরা চৌধুরী :
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের রায় শুধু ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণই বদলে দিচ্ছে না, বরং দেশটির দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান জনমত এবং এ ধরনের প্রকল্প স্থগিত বা সীমিত করার পক্ষে নির্বাচনী সমর্থন সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর (WSJ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এমনকি নির্বাচনের রাতে সানফ্রান্সিসকো অপেরা হাউসে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও নির্বাহীদের আলোচনাতেও উঠে আসে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে ভোটারদের অবস্থানের বিষয়টি।

ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাধা, চাপে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন। এ কারণে মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, ওপেনএআইসহ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বড় আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।
কিন্তু এসব স্থাপনার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন, যা স্থানীয় পরিবেশ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নির্বাচনে ওহাইও, মিশিগান, টেক্সাস ও জর্জিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এমন প্রার্থীরা সমর্থন পেয়েছেন, যারা ডেটা সেন্টার নির্মাণে নিয়ন্ত্রণ, সাময়িক স্থগিতাদেশ কিংবা কঠোর সরকারি নীতিমালার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ওহাইওর এক ডজনেরও বেশি শহরে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ বন্ধ বা সীমিত করার পক্ষে ভোট পড়েছে। কানসাস, ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি এলাকাতেও একই ধরনের উদ্যোগ সমর্থন পেয়েছে।

OpenAI-এর সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় পুনর্বিবেচনা

নির্বাচনের ফলাফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনায়ও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

WSJ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের পরদিন বুধবার সকালে OpenAI-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আলোচনা করছিলেন, নির্বাচনী ফলাফলের কারণে ২০২৭ সালের ডেটা সেন্টার সক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রত্যাশা নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে কি না।

অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে যে বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, স্থানীয় ও রাজনৈতিক বাধার কারণে তার বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে।

বিনিয়োগকারী ব্র্যাড গারস্টনারের একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী বছরের যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টার নির্মাণ পরিকল্পনার প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এটি তাঁর শিল্পখাতভিত্তিক মূল্যায়ন, কোনো নিশ্চিত সরকারি পূর্বাভাস নয়।

তিন অঙ্গরাজ্যেই বড় বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
টেক্সাস, জর্জিয়া ও ওহাইও—এই তিন অঙ্গরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত ডেটা সেন্টার সক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও বেশি কেন্দ্রীভূত বলে WSJ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে এসব অঙ্গরাজ্যে নতুন নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণ স্থগিতাদেশ কিংবা অনুমোদন প্রক্রিয়া কঠোর হলে দেশটির এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে টেক্সাসের নবনির্বাচিত গভর্নর জিনা হিনোজোসা নির্বাচনী প্রচারে ডেটা সেন্টার নির্মাণে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা নতুন নিয়ম প্রণয়ন না করা পর্যন্ত নির্মাণকাজে বিরতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

প্রযুক্তির উন্নয়ন বনাম সাধারণ মানুষের স্বার্থ
ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি হলো, এসব প্রকল্প নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, স্থানীয় কর-রাজস্ব বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।

আইওয়ার সিডার র‌্যাপিডস শহরে নির্মাণাধীন দুটি ডেটা সেন্টার প্রকল্পের সঙ্গে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সুবিধার বিষয় যুক্ত হয়েছে বলে WSJ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, এসব প্রকল্পের জন্য বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা স্থানীয় গ্রাহকদের ব্যয় বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ ও স্থানীয় পানির ব্যবহার, শব্দদূষণ এবং আবাসিক এলাকার কাছাকাছি বিশাল স্থাপনা নির্মাণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

এ কারণে বিতর্কটি এখন শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে নয়; বরং প্রযুক্তির সুফল কারা পাবে এবং এর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ব্যয়ের বোঝা কারা বহন করবে, সেই প্রশ্নেও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।

অন্যদিকে লিংকডইনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এআই-সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

অতএব, ডেটা সেন্টার নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি বাধা সৃষ্টি হলে প্রযুক্তি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, নির্মাণশিল্প এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক খাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নির্বাচনের পর ডেটা সেন্টার-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও চাপ দেখা গেছে। WSJ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার CoreWeave-এর শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশ এবং Applied Digital-এর শেয়ার প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে।

সামনে কঠিন সমীকরণ
এবারের নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতকে একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। এতদিন এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হলেও এখন স্থানীয় জনগণের সম্মতি, পরিবেশ সুরক্ষা, বিদ্যুৎ ও পানির ন্যায্য ব্যবহার এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু বিনিয়োগ ও মুনাফার হিসাব করলেই চলবে না; স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ এবং জনস্বার্থকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

নির্বাচনের এই বার্তা স্পষ্ট—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে নয়; সেই প্রযুক্তির প্রভাব যাঁদের জীবন, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে পড়বে, তাঁদের মতামতও এখন বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension